বাংলা নববর্ষ রচনা
সূচনা
সময়ের নিয়মে ‘পুরাতন বছরের জীর্ণ ক্লান্ত রাত্রি’র অন্তিম প্রহরে দীপ্ত সূর্যোদয় ঘোষণা করে আরেকটি নতুন বছরের আগমনী বার্তা, যে বার্তা বহন করে অপার সম্ভাবনা, অনেক স্বপ্ন, অফুরন্ত আনন্দ। নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে মানুষ পেরিয়ে যেতে চায় তার পুরনো হতাশা, ব্যর্থতা আর অপ্রাপ্তির বেদনাকে; প্রাপ্তির আনন্দে জীবনকে পূর্ণ করার স্বপ্ন বুনে নতুন করে। সাফল্যের দোরগোড়ায় নিজেকে পৌঁছানোর উদ্যম নিয়ে শুরু করে নতুন পথচলা। উৎসবে উৎসবে মানুষ বরণ করে নেয় এই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে। দেশে দেশে নতুন বছরের এই আড়ম্বরময় বরণ হয়ে উঠেছে ঐতিহ্য।দেশে দেশে নববর্ষ
সময়ের ফ্রেমে বন্দি মানুষেরা সময়ের হিসাব মেনেই তার স্বপ্ন বুনে, জীবন সাজায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবম্বিধ বহু প্রয়োজনে মানুষ সময়কে দিন, সপ্তাহ, মাস, বছরে বিভাজন করে। আর এর জন্য মানুষ নির্ভর করে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধির ওপর। এই নির্ভরতা কখনো সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর প্রদক্ষেণ, আবার কখনো পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের প্রদক্ষেণের সময়সীমার ওপর। সৌর বা চান্দ্র যা-ই হোক মানূষ এই সময়ের বৃত্তে নিজের কর্মপরিকল্পনা সাজায় এবং তা বাস্তবায়নে প্রবৃত্ত হয়। কখনো স্বপ্ন পূরণের আনন্দে হয় আত্মহারা; আবার কখনো মূহ্যমান হয় স্বপ্নভঙ্গের বেদনায়। তবে মানুষ কখনো চূড়ান্তভাবে পরাভূত হয় না; নতুন বছরের আগমনে অতীতের সকল গস্নানি মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে শিরদারা সোজা করে কর্মে প্রবৃত্ত হয়। নতুন বছর মানুষের মনে সৃষ্টি করে নতুন উদ্দীপনা। তাই দেশে দেশে নববর্ষ হয়ে ওঠেছে উৎসবের উপলক্ষ। তবে দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নববর্ষ উদ্যাপিত হয়ে থাকে। বছরের প্রারম্ভিক সময়টি কোথাও নির্ধারিত হয়েছে ধর্মীয় কোন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে, আবার কোথাও সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক বিবেচনায়। মুসলমান ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নববর্ষ উদ্যাপন করে নিজ নিজ ধর্মের ধর্মপ্রবর্তকের ঐতিহাসিক ঘটনার তাৎপর্যের আলোকে। আবার জাতি হিসেবে বাঙালি, চিনা, জাপানি, ইরানি- এ সকল জাতি পালন করে নিজ নিজ নববর্ষ উৎসব। যে কোন নামে, যে কোন সময়েই উদ্যাপন করা হোক না কেন, নববর্ষ অনুষ্ঠানের অভিন্ন চরিত্র হলো এর শুভবোধ, সর্বজনীনতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা।বাঙালির জীবনে নববর্ষ
এক সর্বজনীন কল্যাণ চেতনায় উদ্দীপিত হয়ে বাঙালি মেতে ওঠে নববর্ষের বর্ণাঢ্য আয়োজনে। ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের সকল সীমারেখা মুছে দিয়ে বাঙালি এক অভিন্ন আত্মায় মিলিত হয়, নির্মল আনন্দে চিত্তকে করে পরিপস্নাবিত। এ দিনে চিত্তের দীনতা, বিত্তের ঊনতা, জীবনের হতাশা আর রিক্ততাকে পেছনে ফেলে প্রতিটি বাঙালি সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হয়। প্রাণের উচ্ছ্বাসে সাজায় ঘরদোর, বর্ণিল পোশাকে সাজায় নিজেকে; অকৃত্রিম সহৃদয়তায় পরস্পরকে বাঁধে আলিঙ্গনে, শুভেচ্ছায় সিক্ত করে পরস্পরকে।নববর্ষের উৎসবাদি
বাঙালি জীবনে উৎসবের বান ডেকে আসে নববর্ষ; বিচিত্র উৎসবে মুখর হয়ে ওঠে এদেশের প্রতিটি শহর- বন্দর- গ্রামের আনাচ-কানাচ। নির্মল আনন্দ দানের পাশাপাশি উৎসব গুলোর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বও অপরিসীম। বছরের হিসাব-নিকাশ, চাষাবাদ, খাজনা আদায়, বিয়ের তারিখ ঠিক করা - এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাঙালি গ্রহণ করে বাংলা বর্ষপঞ্জি মেনে; আর তা করে উৎসবের আমেজে। নববর্ষের উৎসব গুলোর মধ্যে পূণ্যাহ, হালখাতা, বৈশাখি মেলা, প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।(ক) পূণ্যাহ : পূণ্যাহ শব্দটির শাব্দিক অর্থ হলো পুণ্য কাজের জন্য জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুমোদিত প্রশস্ত দিন। কিন্তু বাংলায় এর অর্থ দাঁড়িয়েছে নতুন বছরে প্রজাদের কাছ থেকে জমিদারদের খাজনা আদায়ের শুরুর দিন। এ দিনে প্রজারা ভাল পোশাক পরে জমিদারদের কাছারি বাড়িতে খাজনা দিতে যেতেন; আর জমিদারগণ মিষ্টান্ন ও পানসুপারি দিয়ে প্রজাদের আপ্যায়ণ করতেন ও তাদের সুখ-দুঃখের খবর নিতেন। এভাবে জমিদার-প্রজার মধ্যে পারস্পরিক সহজ ও আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হতো। জমিদারি প্রথা বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পূণ্যাহ অনুষ্ঠানেরও বিলোপ ঘটেছে।
(খ) হালখাতা : হালখাতা নববর্ষের এক বিশেষ ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। বছরের প্রথম দিনটিতে ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিষ্ঠানে ক্রেতা ও শুভাকাঙক্ষীদের আমন্ত্রণ জানায় এবং মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে। ক্রেতারা তাদের বকেয়া পরিশোধ করে পুরনো বছরের লেনদেন সম্পন্ন করে এবং নতুনভাবে লেনদেন শুরু করে। এভাবে ব্যবসায়ী ও খদ্দেরের মধ্যে গড়ে ওঠে এক মধুর সম্পর্ক।
(গ) বৈশাখি মেলা : বৈশাখি মেলা এ দেশের এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। এ মেলায় দেশীয় কুটির শিল্পজাত পণ্যের সমারোহ ঘটে। এখানে দেশীয় খাদ্য আর শিশুদের মন-ভোলানো পণ্য ক্রয়ের ধুম পড়ে যায়। গার্হস্থ্য জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও গ্রামের মানুষেরা মেলা থেকে সংগ্রহ করে। ছেলে, যুবা, বুড়ো, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের আনন্দ-কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে মেলার প্রাঙ্গন। শহরেও মেলা এসেছে বর্ণাঢ্য রূপ নিয়ে। মেলা গুলোতে কুটির শিল্পজাত দ্রব্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয় হয়। এ মেলার মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়। বই মেলা শহরে নববর্ষ উদ্যাপনের নতুন অনুষঙ্গ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নেচে গেয়ে শহরের মানুষেরা নববর্ষকে বরণ করে নেয়। উৎসবকে প্রাণবন্ত করতে অতিথিপরায়ণ বাঙালি এ দিনে আত্মীয়- স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। মুখরোচক খাবার আর গল্পে-আড্ডায় উৎসবমুখর পরিবেশে তারা কাটিয়ে দেয় দিনটি।
নববর্ষ উপলক্ষে জাতীয় কর্মসূচি
বাংলাদেশ সরকার নববর্ষকে সর্বজনীন উৎসব হিসেবে বিবেচনা করে এবং দিবসটিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালন করে। দিবসটিকে উৎসবের রঙে রাঙানোর জন্য সরকারি কর্মচারীদেরকে নববর্ষ ভাতা প্রদান করছে। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, নজরুল ইনস্টিটিউট, ছায়ানট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি- এসব প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে থাকে। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এক বিশেষ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলার প্রভাতি অনুষ্ঠান ও মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলা নববর্ষ বরণে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর নববর্ষ বরণ
বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠী বর্ণাঢ্য আয়োজনে চৈত্র সংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করে। এটি পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা ‘বিজু’, মারমারা ‘সাংগ্রাই’, ত্রিপুরারা ‘বৈসুক’ ইত্যাদি নামে আখ্যা দিলেও গোটা পাহাড়ি অঞ্চলে এটি ‘ বৈসাবি’ নামে অভিহিত।বাঙালি জীবনে নববর্ষের তাৎপর্য
বাংলাদেশে বহু জাতি-গোষ্ঠীর লোকের বসবাস। প্রতিটি সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজ নিজ ধর্ম ও তার উৎসব। তবে নিজ নিজ ধর্মীয় পরিচয় ছাপিয়ে এ দেশের মানুষের সর্বজনীন পরিচয় বাঙালি হিসেবে এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষই পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ। পহেলা বৈশাখ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। এ উৎসবের মাধ্যমেই এদেশের সকল মানুষ সকল ভেদাভেদ ভুলে এক অখ- বাঙালি চেতনায় উজ্জীবিত হয়। ফলে জাতিগত ঐক্য ও সংহতি দৃঢ় হয়; আমাদের জাতীয় চেতনা হয় মজবুত।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions