Home » » স্বরধ্বনি উচ্চারণের নিয়ম

স্বরধ্বনি উচ্চারণের নিয়ম

স্বরধ্বনি উচ্চারণের নিয়ম

স্বরধ্বনির উচ্চারণ 

ই এবং ঈ-ধ্বনির উচ্চারণে জিহবা এগিয়ে আসে এবং উচ্চে অগ্ৰতালুর কঠিনাংশের কাছাকাছি পৌছে। এ ধ্বনির উচ্চারণে জিহবার অবস্থান ই-ধ্বনির মতো সম্মুখেই হয়, কিন্তু একটু নিচে এবং আ-ধ্বনির বেলায় আরও নিচে। ই ঈ এ (অ) ধ্বনির উচ্চারণে জিহবা এগিয়ে সম্মুখভাগে দাঁতের দিকে আসে বলে এগুলোকে বলা হয় সম্মুখ ধ্বনি। ই এবং ঈ-র উচ্চারণের বেলায় জিহবা উচ্চে থাকে। তাই এগুলো উচ্চসম্মুখ স্বরধ্বনি। এ মধ্যাবস্থিত সম্মুখ স্বরধ্বনি এবং আ নিম্নবস্থিত সম্মুখ স্বরধ্বনি। 


উ এবং উ-ধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বা পিছিয়ে আসে এবং পশ্চাৎ তালুর কোমল অংশের কাছাকাছি ওঠে। ও-ধ্বনির উচ্চারণে জিহবা আরও একটু নিচে আসে। অ-ধ্বনির বেলায় তার চেয়েও নিচে আসে। উ উ ও অ-ধ্বনির উচ্চারণে জিহবা পিছিয়ে আসে বলে এগুলোকে পশ্চাৎ স্বরধ্বনি বলা হয়। উ ও উ-ধ্বনির উচ্চারণকালে জিহ্বা উচ্চে থাকে বলে এদের বলা হয় উচ্চ পশ্চাৎ স্বরধ্বনি ও মধ্যাবস্থিত পশ্চাৎ স্বরধ্বনি এবং অ-নিম্নবস্থিত পশ্চাৎ স্বরধ্বনি।


বাংলা আ-ধ্বনির উচ্চারণে জিহবা সাধারণত শায়িত অবস্থায় থাকে এবং কণ্ঠের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং মুখের সম্মুখ ও পশ্চাৎ অংশের মাঝামাঝি বা কেন্দ্রস্থানীয় অংশে অবস্থিত বলে আ-কে কেন্দ্রীয় নিম্নবস্থিত স্বরধ্বনি এবং বিবৃত ধ্বনিও বলা হয়।


শব্দে অবস্থানভেদে অ দুইভাবে লিখিত হয়

১. স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত অ। যেমন—অমর, অনেক। ২. শব্দের মধ্যে অন্য বর্ণের সঙ্গে বিলীনভাবে ব্যবহৃত অ। যেমন— কর, বল। এখানে ক এবং র আর ব ।

এবং ল বর্ণের সঙ্গে অ বিলীন হয়ে আছে। (ক্ + অ + বৃ + অ + অ + ল + অ)। 


শব্দের অ-ধ্বনির দুই রকম উচ্চারণ পাওয়া যায়।

১. বিবৃত বা স্বাভাবিক উচ্চারণ। যেমন— অমল, অনেক, কত। ২. সংবৃত বা ও-ধ্বনির মতো উচ্চারণ। যথা— অধীর, অতুল, মন। এ উচ্চারণগুলোতে অ-এর উচ্চারণ

অনেকটা ও-এর মতো (ওধীর, ওতুল, মোন)। 


১. ‘অ-ধ্বনির স্বাভাবিক বা বিবৃত উচ্চারণ

(ক) শব্দের আদিতে 

১. শব্দের আদিতে না-বোধক ‘অ' যেমন – অটল, অনাচার।

২. ‘অ' কিংবা ‘আ’-যুক্ত ধ্বনির পূর্ববর্তী অ-ধ্বনি বিবৃত হয়। যেমন – অমানিশা, কথা। 

(খ) শব্দের মধ্যে ও অন্তে

১. পূর্ব বরের সঙ্গে মিল রেখে স্বরসঙ্গতির কারণে বিবৃত ‘অ’। যেমন – কলম, বৈধতা, যত, শ্রেয়ঃ।  

২. ঋ-ধ্বনি, এ-ধ্বনি, ঐ-ধ্বনি এবং ঔ-ধ্বনির পরবর্তী ‘অ’ প্রায়ই বিবৃত হয়। যেমন – তৃণ, দেব, ধৈর্য, মোলক, মৌন ইত্যাদি। 

৩. অনেক সময় ই-ধ্বনির পরের ‘অ' বিবৃত হয়। যেমন – গঠিত, মিত, জনিত ইত্যাদি।


২. অ-ধ্বনির সংবৃত উচ্চারণ 

অ-ধ্বনির বিবৃত উচ্চারণে চোয়াল বেশি ফাঁকা হয়। ঠোট তত বাকা বা গোল হয় না। কিন্তু সংবৃত উচ্চারণে চোয়ালের ফাক কম ও ঠোট গোলাকৃত হয়ে “ও’-এর মতো উচ্চারিত হয়। সংবৃত উচ্চারণকে ‘বিকৃত', ‘অপ্রকৃত’ বা ‘অস্বাভাবিক' উচ্চারণ বলা ঠিক নয়। সংবৃত উচ্চারণও ‘স্বাভাবিক’, ‘অবিকৃত’ ও ‘প্রকৃত উচ্চারণ।

(ক) শব্দের আদিতে 

১. পরবর্তী বর সংবৃত হলে শব্দের আদি ‘অ' সংবৃত হয়। যেমন- অতি (ওতি), করুণ (কোরুণ), করে (অসমাপিকা ‘কোরে’)। কিন্তু সমাপিকা ‘করে' শব্দের ‘অ’ বিবৃত। 

২. পরবর্তী ই, উ - ইত্যাদির প্রভাবে পূর্ববর্তী র-ফলাযুক্ত ‘অ' সংবৃত হয়। যেমন – প্রতিভা (প্রোতি), প্রচুর (প্রোচুর) ইত্যাদি। কিন্তু অ, আ ইত্যাদির প্রভাবে পূর্ব ‘অ’ বিবৃত হয়। যেমন—প্রভাত, প্রত্যয়, প্রণাম ইত্যাদি।


(খ) শব্দের মধ্যে ও অন্তে 

১. তর, তম, তন প্রত্যয়যুক্ত বিশ্লেষণ পদের অন্ত্য ঘর ‘অ' সংবৃত হয়। যেমন – প্রিয়তম (প্রিয়তমো), গুরুতর (গুরুতরো) ইত্যাদি। 

২. ই, উ-এর পরবর্তী মধ্য ও অন্ত্য ‘অ' সংবৃত। যেমন – পিয় (পিয়ো), যাবতীয় (যাবতীয়ো) ইত্যাদি।


আ : বাংলায় আ-ধ্বনি একটি বিবৃত ঘর। এর উচ্চারণ হ্রস্ব ও দীর্ঘ দু-ই হতে পারে। এর উচ্চারণ অনেকটা ইংরেজি ফাদার (father) ও কাম (calm) শব্দের আ (a) -এর মতো। যেমন- আপন, বাড়ি, মা, দাতা ইত্যাদি।  বাংলায় একাক্ষর (Monosyllabic) শব্দে আ দীর্ঘ হয়। যেমন- কাজ শব্দের আ দীর্ঘ এবং কাল শব্দের আ হ্রস্ব। এরূপ- যা, পান, ধান, সাজ, চাল, চাঁদ, বাঁশ। 


ই ঈ : বাংলায় সাধারণত হ্রস্ব ই-ধ্বনি এবং দীর্ঘ ঈ-ধ্বনির উচ্চারণে কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। একাক্ষর | শব্দের ই এবং ঈ - দুটোই দীর্ঘ হয়। যেমন- বিষ, বিশ, দীন, দিন, শীত।


উ উ : বাংলায় উ এবং ঊ ধ্বনির উচ্চারণে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। ই ঈ-ধ্বনির মতো একাক্ষর শব্দে এবং বহু অক্ষর-বিশিষ্ট শব্দের বদ্ধাক্ষরে বা প্রান্তিক যুক্তাক্ষরে উচ্চারণ সামান্য দীর্ঘ হয়। যেমন: চুল (দীর্ঘ), চুলা (হ্রদ), ভূত, মুক্ত, তুলতুলে, তুফান, বহু, অজু, করুণ। 

ঋ : স্বাধীনভাবে ব্যবহূত হলে ঋ-এর উচ্চারণ রি অথবা রী-এর মতো হয়। আর ব্যঞ্জন ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হলে র-ফলা+ ই-কার এর মতো হয়। যেমন- ঋণ, ঋতু, (রীন, রীতু, মাতৃ (মাত্রি), কৃষ্টি (ক্রিষ্টি)।


দ্রষ্টব্য : বাংলায় ঋ-ধ্বনিকে স্বরধ্বনি বলা চলে না। সংস্কৃতে এই ধ্বনিটি স্বরধ্বনিরূপে উচ্চারিত হয়।


সংস্কৃত প্রয়োগ অনুসারেই বাংলা বর্ণমালায় এটি স্বরবর্ণের মধ্যে রক্ষিত হয়েছে। 

এ : এ-ধ্বনির উচ্চারণ দুই রকম : সংবৃত ও বিবৃত। যেমন – মেঘ, সংবৃত/বিবৃত, খেলা-(খালা), বিবৃত।। ১. সংবৃত

ক) পদের অন্তে ‘এ’ সংবৃত হয়। যেমন- পথে, ঘাটে, দোষে, গুণে, আসে ইত্যাদি। 

খ) তৎসম শব্দের প্রথমে ব্যঞ্জনধ্বনির সঙ্গে যুক্ত এ-ধ্বনির উচ্চারণ সংবৃত হয়। যেমন- দেশ, প্রেম, শেষ ইত্যাদি।

গ) একাক্ষর সর্বনাম পদের ‘এ’ সংবৃত হয়। যেমন- কে, সে, যে। 

ঘ) ‘হ’ কিংবা আকারবিহীন যুক্তধ্বনি পরে থাকলে ‘এ’ সংবৃত হয়। যেমন- দেহ, কেহ, কেষ্ট।

ঙ) ‘ই’ বা ‘উ’-কার পরে থাকলে ‘এ’ সংবৃত হয়। যেমন – দেখি, রেণু, বেলুন। 


২. বিবৃত : ‘এ’ ধ্বনির বিবৃত উচ্চারণ ইংরেজি ক্যাট (cat) ও ব্যাট (bat)-এর ‘এ’ (a)-এর মতো। যেমন- দেখ (দ্যাখ), একা (এ্যাকা) ইত্যাদি। 


এ- ধ্বনির এই বিবৃত উচ্চারণ কেবল শব্দের আদিতেই পাওয়া যায়, শব্দের মধ্যে ও অন্তে পাওয়া যায় না।

ক) দুই অক্ষর বিশিষ্ট সর্বনাম বা অব্যয় পদে- যেমন : এত, হেন, কেন ইত্যাদি। কিন্তু ব্যতিক্রম | যেথা, সেথা, হেথা। 

খ) অনুবার ও চন্দ্রবিন্দু যুক্ত ধ্বনির আগের এ-ধ্বনি বিবৃত। যেমন—খেড়া, চেড়া, স্যাঁতসেঁতে, গেঁজেল।


গ) খাঁটি বাংলা শব্দে : যেমন— খেমটা, ঢেপসা, তেলাপোকা, তেনা, দেওর। 

ঘ) এক, এগার, তের – এ কয়টি সংখ্যাবাচক শব্দে, ‘এক’ যুক্ত শব্দেও : যেমন— একচোট, একতলা, একঘরে ইত্যাদি। 

ঙ) ক্রিয়াপদের বর্তমান কালের অনুজ্ঞায়, তুচ্ছার্থ ও সাধারণ মধ্যম পুরুষের রূপে; যেমন- দেখ (দ্যাখ), দেখ (দ্যাখো) , খেল্ (খ্যাল), খেল (খ্যালো), ফেস্ (ফ্যা), ফেল (ফ্যালো) ইত্যাদি। 


ঐ : এ ধ্বনিটি একটি যৌগিক স্বরধ্বনি। অ + ই কিংবা ও + ই = অই, ওই। অ এবং ই- এ দুটো ঘরের মিলিত ধ্বনিতে ঐ-ধ্বনির সৃষ্টি হয়। যেমন – ক্ + অ + ই = কই, কৈ; বৃ + ই + ধ = বৈধ ইত্যাদি। এরূপ — বৈদেশিক, ঐক্য, চৈতন্য। 


ও: বাংলা একাক্ষর শব্দে ও-কার দীর্ঘ হয়। যেমন- গো, জোর, রোগ, ভোর, কোন, বোন ইত্যাদি। অন্যত্র সাধারণত ব্ৰত্ব হয়। যেমন- সােনা, কারো, পুরোভাগ। ও-এর উচ্চারণ ইংরেজি বোট (boat) শব্দের (oa)-এর মতো।

0মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Comment below if you have any questions

Contact form

নাম

ইমেল*

বার্তা*

-->