রূপান্তরিত শিলা কাকে বলে
রূপান্তরিত শিলা (Metamorphic Rocks) : পৃথিবীর পৃষ্ঠে স্বাভাবিক তাপ ও চাপে বিদ্যমান শিলা বস্তু স্বাভাবিক তাপের চেয়ে অধিক তাপ বা চাপের দ্বারা পরিবর্তনের ফলে উৎপন্ন শিলা হলো রূপান্তরিত শিলা। প্রবল তাপ ও চাপের সঙ্গে পৃথিবীর ত্বকে বিদ্যমান গরম ফ্লুইডের ক্রিয়াও শিলার পরিবর্তন ঘটায়। এই পরিবর্তনের ফলে নতুন মণিকের সৃষ্টি হয় এবং পরিবর্তিত অবস্থায় স্থিতিশীল থাকে। নতুন মণিক সৃষ্টির ফলে গ্রথন বা গঠনও পরিবর্তন হয়।
রূপান্তরিত শিলাকে দুই গ্রুপে বিভক্ত করা যেতে পারে; বিচূর্ণজাত শিলা, শুধুমাত্র যান্ত্রিক বলের ক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন হয়; এবং পুণঃকেলাসিত বা রূপান্তরি শিলা, রূপান্তরজ চাপ ও তাপের প্রভাবে উৎপন্ন হয়। বিচূর্ণজাত শিলাগুলো যান্ত্রিকভাবে নিষ্পেষিত ও চূর্ণিত হয়। এই ধরনের শিলাগুলো ডায়নামোমেটামরিজম বা গতীয় রূপান্তরের ফলে উৎপন্ন বস্তুর প্রতিনিধিত্ব করে। এসব শিলাতে রাসায়নিক ও মণিকবিদ্যাগত পরিবর্তন খুব সামান্য। শিলাতে ক্ষুদ্র আকারের মণিক দানা বিদ্যমান। প্রতিটি মণিক দানা প্রান্ত বরাবর ভেঙ্গে যায় এবং ভগ্নশেষের মুকুট বা আলগাভাবে ছড়ানো খন্ডিতাংশ দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে।
রূপান্তরিত শিলাগুলো হলো পুনঃকেলাসিত শিলা। তরল পদার্থ থেকে সরল পুনঃকেলাসনের সূত্রগুলো রূপান্তরিত শিলাতে পুনঃকেলাসনের মতো নয়। কারণ তরল পদার্থে কেলাসগুলো স্বাধীনভাবে তৈরি হয়, কিন্তু রূপান্তরিত শিলাতে পুণঃকেলাসনের সময়ে নতুন কেলাস সৃষ্টি পুরাতন মণিক দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। পরিণতিতে রূপান্তরিত শিলাতে যে গঠনের সৃষ্টি হয় তা স্বাতন্ত্রসূচক এবং এদের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ এসব মণিক নানাভাবে পুণঃকেলাসনের ভৌত-রাসায়নিক পরিবেশকে প্রতিফলিত করে যার মাধ্যমে রূপান্তরিত শিলার উৎপত্তি ও ইতিহাস জানা যায়।
রূপান্তরিত মণিকগুলোকে এদের কেলাসনের বল হ্রাসের ক্রমানুসারে নবোদগত ঋজুপার্শ্ব কেলাসপূর্ণ সিরিজ বা ক্রিস্টোলোব্লাস্টিক বিন্যাস করা যেতে পারে; (১) স্ফিন, রুটাইল, গারনেট, টরমেলিন, স্টোরোলাইট, কায়ানাইট, (২) এপিডট, জয়িসাইট; (৩) পাইরোক্সিন, হর্নব্লেন্ড; (৪) ফেরোম্যাগনেসাইট, হলোমাইট, অ্যালবাইট; (৫) মাসকোভাইট, বায়োটাইট, ক্লোরাইট; (৬) ক্যালসাইট; (৭) কোয়ার্টজ, প্ল্যাজিওক্লেজ; এবং (৮) অর্থোক্লেজ, মাইক্রোক্লিন।
আগ্নেয় ম্যাগমা উচ্চ তাপমাত্রায় পাললিক শিলাকে ভেদ করতে পারে, শিলাপৃষ্ঠে পৌছাতে পারে বা উদ্বেধী বস্তু (প্লুটন) আকারে জমাট বাধতে পারে। এসব বস্তু থেকে চারপাশের পললে তাপ ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু পললের মণিকগুলো স্বল্প তাপমাত্রায় খাপ খাওয়ানো অবস্থায় থাকে সেহেতু তাপমাত্রার বৃদ্ধি এসব মণিকের মণিকবিদ্যাগত এবং গ্রথনিক পূর্ণগঠন ঘটাবে। এ ধরনের পরিবর্তন ষ্পর্শ রূপান্তর হিসেবে পরিচিত।
শিলা রূপান্তরে উদবেধের আকারই কেবল প্রভাব ফেলে না, অন্যান্য নিয়ামকও রূপান্তরে ভূমিকা রাখে। নিয়ামকগুলো হচ্ছে আচ্ছাদিত বস্তুর পরিমাণ ও সিস্টেমের সন্নিকতটা, স্থানীয় শিলার গঠন ও গ্রথন এবং গ্যাস ও উষ্ণোদকীয় বাহিত ম্যাগমাজ প্রবাহের প্রাচুর্য। শিলার তাপ পরিবাহিতা এতই কম যে গ্যাস ও বাষ্প প্রবাহ স্থানীয় শিলার ভিতরে তাপের ও স্থানান্তরে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
মণিক পর্বের সুনির্দিষ্ট সিরিজগুলোকে বেছে বের করা হয়েছে। সর্বাপেক্ষা কম রূপান্তরিত মাত্রার পাললিক শিলাগুলো পুনঃকেলাসিত হয়ে জিওলাইট পর্বের শিলা তৈরি করে। সামান্য বেশি তাপমাত্রায় সবুজ শিস্ট পর্বের সৃষ্টি হয়- ক্লোরাইট, অ্যালবাইট এবং এপিডট এই পর্বের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত মণিক। অধিক মাত্রার রূপান্তর এপিডট-অ্যাম্ফিবোলাইট পর্ব তৈরি করে এবং আরো অধিক রূপান্তরের ফলে প্রকৃত অ্যাম্ফিবোলাইট পর্বের সৃষ্টি হয় এবং এ পর্বে ক্লোরাইট ও এপিডটের স্থান হর্নব্লেন্ড ও প্ল্যাজিওক্লেজ দখল করে। সর্বাপেক্ষা অধিক মাত্রার আঞ্চলিক রূপান্তরের প্রতিনিধিত্বকারী পর্ব হলো গ্রানুলাইট পর্ব। এই পর্বের অধিকাংশ স্থিতিশীল মণিক পানিমুক্ত অবস্থায় থাকে, যেমন- পাইরোক্সিন ও গারনেট। যে কোনো পাললিক বস্তু বিভিন্ন মণিক পর্বের নিয়ম অনুসারে পুনঃকেলাসিত হবে। রূপবিকৃতি, পুনঃকেলাসন এবং অনুক্রমিক ধাপে পরিবর্তনের দ্বারা পললের ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনের ফলে পর্বের সৃষ্টি হয়; সবুজশিষ্ট পর্ব→এপিডট-অ্যাম্ফিবোলাইটপর্ব→অ্যাম্ফিবোলাইট পর্ব→গ্রানুলাইট পর্ব।
সাধারণ মহাদেশীয় ত্বক রূপান্তরিত শিলা দিয়ে গঠিত। যেখানে তাপীয়, যান্ত্রিক ও ভূ-রাসায়নিক সাম্য বিদ্যমান সেখানেই কেবল রূপান্তরিত শিলা থাকে। এ ধরনের স্বাভাবিক অবস্থার সীমা ভূ-ত্বকের গভীরে অবস্থান করে, যেখানে অতি-রূপান্তর বিভেদক বিগলন ঘটায় এবং স্থানীয় ম্যাগমার সৃষ্টি করে। যখন সাম্যাবস্থা পুণঃস্থাপিত হয় তখন এসব ম্যাগমা জমাট বাধে ও রূপান্তরিত শিলায় পুনঃকেলাসিত হয়। অবক্ষয় প্রক্রিয়াগুলো পৃষ্ঠদেশে বহিঃস্থভাবে শিলাকে জারিত ও চূর্ণিত করে এবং ক্ষণস্থায়ী বস্তু হিসাবে পলল উৎপন্ন করে। এভাবে চক্রটি শেষ হয় এবং কোনো প্রকার বিরতি ব্যতীত শিলা উৎপন্ন হতে থাকে। মহাদেশীয় ত্বকে প্রাপ্ত সকল শিলাই এক সময় মেটামরফাইট ছিলো।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions