Home » » হজের ইহরাম: এহরামের কাপড় পরার নিয়ম

হজের ইহরাম: এহরামের কাপড় পরার নিয়ম

হজের ইহরাম: এহরামের কাপড় পরার নিয়ম

 এহরামের মাসায়েল:

 এহরামের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান পূর্বক (পুরুষের জন্য) হজ্জ অথবা উমরা কিংবা হজ্জ ও উমরা উভয়টির নিয়ত করে তালবিয়া পড়া এবং বায়তুল্লাহ শরীফের তওয়াফ ও সাফা-মারওয়া সায়ী করার পর মাথা মুণ্ডন করে বা চুল ছোট করে মুক্ত হওয়া পর্যন্ত অবস্থাকে এহরাম বলে।


কোথা থেকে এহরাম বাধবেন:

 হজ্জ বা উমরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলে মীকাত অর্থাৎ, শরী'আত কর্তক এহরাম বাধার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার পূর্বেই এহরাম বেধে নেয়া জরূরী। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান প্রভৃতি পূর্বাঞ্চলীয় লোকদের জন্য এই নির্ধারিত স্থানটি হল ইয়ালামলাম (মক্কা থেকে দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত একটি পাহাড়ের নাম)। সামুদ্রিক জাহাজযোগে হজ্জ যাত্রীগণ এ স্থান বরাবর অতিক্রম করার পূর্বে অবশ্যই এহরাম বেধে নিবেন। প্লেন এ স্থান বরাবর রেখা কখন অতিক্রম করে তা টের পাওয়া কঠিন; তাই প্লেন যোগে হজ্জ বা উমরার উদ্দেশ্যে মক্কা গমনকারীর জন্য প্লেনে আরোহণের পূর্বেই এহরাম বেধে নেয়া উচিত। বিমানবন্দরে যেয়ে বা হাজী ক্যাম্প থেকে বা বাসা থেকে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে বাসায় বা মসজিদে যে কোন স্থানে এহরাম বাধা যায়।

* যারা মদীনা শরীফ আগে যাওয়ার ইচ্ছা করবেন তারা বিনা এহরামেই রওয়ানা হবেন । মদীনা যিয়ারতের পর যখন মক্কা শরীফ-এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন, তখন মদীনা শরীফ থেকে মক্কা শরীফ গমনকরীদের মীকাত যেহেতু যুলহুলাইফা তাই যুলহুলাইফা নামক স্থান (বর্তমানে “বীরে আলী” নামে পরিচিত) থেকে বা মদীনায় থেকেই এহরাম বেধে মক্কা শরীফ রওয়ানা হবেন।

* যারা মক্কা শরীফে থেকে নফল উমরা করতে চান এহরাম বাধার জন্যে তাদেরকে হারামের সীমানার বাইরে যেয়ে এহরাম বেধে আসতে হবে। এর জন্য সবচেয়ে উত্তম স্থান হল তানয়ীম। বর্তমানে সেখানে মসজিদে আয়েশা নামক একটি মসজিদ আছে। তাই মসজিদে আয়েশায় গিয়ে এহরাম বেধে । এসে নফল উমরা করবেন। জে’রানা নামক স্থান থেকেও এহরাম বেধে আসা যায়।


এহরাম বাধার তরীকা:

* এহরাম বাধার ইরাদা হলে প্রথমে ক্ষৌরকার্য করে নিন-নখ কাটুন, বগল ও নাভির নীচের পশম পরিষ্কার করুন। এগুলো মোস্তাহাব। মাথা মুণ্ডানোর অভ্যাস থাকলে মাথা মুণ্ডিয়ে নিন অন্যথায় চুল আঁচড়িয়ে নিন। স্ত্রী সম্ভোগও মোস্তাহাব।

* তারপর এহরামের নিয়তে গোসল করুন, না পারলে উযূ করে নিন। | এটা সুন্নাত । ভালভাবে শরীরের ময়লা দূর করবেন।

* তারপর সেলাই বিহীন (ফাড়া) লুঙ্গি পরিধান করুন অর্থাৎ, একটা চাদর পরিধান করুন এবং একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে নিন। এখন ডান বগলের নীচে দিয়ে পরবেন না। এহরামের কাপড় সাদা রংয়ের হলে উত্তম । পুরুষের। জন্য এহরামের অবস্থায় শরীরের পরিমাপে সেলাই করা হয়েছে-এমন কাপড় পরিধান করা নিষিদ্ধ। মহিলাগণ যে কোন পোশাক পরিধান করতে পারেন । এহরামের কাপড় নতুন বা পরিষ্কার হওয়া উত্তম।

* তারপর সুগন্ধি লাগিয়ে নিন। এটা সুন্নাত।

* তারপর এহরামের নিয়তে দুই রাকআত নফল নামায পড়ে নিন। এটা সনাত । এই দুই রাকআতের মধ্যে প্রথম রাকআতে সূরা কাফিরূন এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা এখলাস পড়া উত্তম। এই নামায মাথায় টুপি সহকারে (বা মাথা ঢেকে)ই পড়তে হয়। নামাযের নিষিদ্ধ বা মাকরূহ ওয়াক্তে এহরাম বাধতে হলে এহরামের নামায না পড়েই এহরাম বাধতে হয়।

* নামাযের পর টুপি খুলে রেখে কেবলামুখী থেকেই এহরামের নিয়ত করতে হবে। বসে বসেই নিয়ত করা উত্তম এবং নিয়ত মুখেও উচ্চারণ করা উত্তম।

* শুধু উমরার এহরাম হলে এভাবে নিয়ত করুন:: হে আল্লাহ, আমি উমরা করতে চাই, তুমি আমার জন্য তা সহজ করে দাও এবং ককূল কর।

* শুধু হজ্জের এহরাম হলে এভাবে নিয়ত করুন: হে আল্লাহ, আমি হজ্জ করতে চাই, তুমি আমার জন্য তা সহজ করে দাও এবং আমার থেকে তা কবুল কর।

* উমরা ও হজ্জ উভয়টার এহরাম হলে এভাবে নিয়ত করুন: হে আল্লাহ, আমি হজ্জ ও উমরা উভয়টার নিয়ত করছি, তুমি সহজ করে দাও এবং কবুল কর।

* তারপর তালবিয়া পড়ুন। তালবিয়া পড়া সুন্নাত, তবে নিয়তের সাথে একবার তালবিয়া বা যে কোন যিকির থাকা শর্ত। তালবিয়া জোর আওয়াজে পড়া সুন্নাত এবং তিনবার পড়া সুন্নাত। মহিলাদের জন্য তালবিয়া জোর আওয়াজে পড়া নিষিদ্ধ, তারা এতটুকু শব্দে পড়বে যে নিজের কানে শোনা যায় । তালবিয়া আরবীতেই পড়া উত্তম। তালবিয়া এই:

لبيك اللهم لبيك لبيك لا شريك لك لبيك إن الحمد والنعمة لك والمتك

لا شريك لك ۔

(লব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ানি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক) অর্থাৎ, আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির। আমি হাজির, কোন শরীক নেই তোমার, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নেয়ামত তোমারই, আর সকল সাম্রাজ্যও তোমার, কোন শরীক নেই তোমার।


বিঃ দ্রঃ নিয়ত ও তালবিয়া পাঠ করার পর এহরাম বাধা সম্পন্ন হয়ে গেল।

তারপর দুরূদ শরীফ পড়ন এবং যা ইচ্ছা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন।, তবে এই দুআ করা উত্তম:

হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট চাই তোমার সন্তুষ্টি এবং জান্নাত। আর তোমার অসন্তোষ ও জাহান্নাম থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই।

* মহিলাগণ হায়েয নেফাসের অবস্থায় থাকলে নামায না পড়ে শুধু নিয়ত করে এবং তালবিয়া পড়ে নিলেই এহরাম শুরু হয়ে যাবে।


এহরামের অবস্থায় যা যা করা উত্তম:

* এহরামের অবস্থায় অধিক পরিমাণে তালবিয়া পড়তে থাকা উত্তম। বিশেষতঃ গাড়ীতে উঠতে, গাড়ী থেকে নামতে, কোন উঁচু স্থানে উঠতে, নীচু স্থানে নামতে, প্রত্যেক নামাযের পর ইত্যাদি মুহূর্তে তালবিয়া পড়া মোস্তাহাব। তালবিয়া পুরুষগণ জোর আওয়াজে পড়বেন, তবে এত জোরে নয় যেন নিজের বা কোন নামাযীর বা ঘুমন্ত মানুষের অসুবিধা হয়।

* ঘর থেকে বের হওয়ার সময়, প্রবেশের সময়, সাক্ষাতের সময়, বিদায়ের সময়, উঠতে-বসতে, সকাল-সন্ধ্যায়, মোট কথা যে কোন ভাবে অবস্থার পরিবর্তন হলে সে সময়ে তালবিয়া পড়া মোস্তাহাব।


এহরাম অবস্থায় যা যা নিষিদ্ধ:

* পুরুষের জন্য শরীরের পরিমাপে বানানো হয়েছে- এমন সেলাই যুক্ত পোশাক নিষিদ্ধ। যেমন জামা, পায়জামা, টুপি, গেঞ্জি, মোজা, সোয়েটার ইত্যাদি। মহিলাদের জন্য হাত মোজা, পা মোজা, অলংকার পরিধান করা জায়েয, তবে না করা উত্তম।

* ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত পুরুষের জন্য মাথা ও চেহারা এবং মহিলাদের জন্য শুধু চেহারা ঢাকা নিষিদ্ধ। মহিলাদের জন্য মাথা ঢাকা রাখা ওয়াজিব। পুরুষগণ কান ও গলা ঢাকতে পারেন।

* এমন জুতা/স্যাণ্ডেল পরিধান করা নিষিদ্ধ, যাতে পায়ের মধ্যবর্তী উঁচু হাড় ঢাকা পড়ে যায়। মহিলাগণ এরূপ জুতা/স্যাণ্ডেল পরিধান করতে পারেন।

* সর্ব প্রকার সুগন্ধি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। সুগন্ধি যুক্ত সাবান ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ।

* নখ, চুল, পশম কাটা ও কাটানো নিষিদ্ধ।

* স্থল ভাগের প্রাণী শিকার করা বা সে কাজে কোন রূপ সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ। তবে মশা, মাছি, ছারপোকা, সাপ, বিচ্ছ ইত্যাদি কষ্টদায়ক প্রাণী মারা জায়েয।

* স্ত্রী সহবাস বা এতদসম্পর্কিত কোন আলোচনা, চুমু দেয়া এবং শাহওয়াত (উত্তেজনা) সহকারে স্পর্শ করা নিষিদ্ধ।

* ঝগড়া বিবাদ করা বা কোন গোনাহের কাজ করা নিষিদ্ধ। এগুলো এমনিতেও নিষিদ্ধ; এহরামের অবস্থায় আরও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

* উকুন মারা নিষিদ্ধ।


বিঃ দ্রঃ মহিলাদের জন্য চেহারা ঢাকা নিষিদ্ধ-এর অর্থ এই নয় যে, চেহারা সম্পূর্ণ খোলা রাখতে হবে যাতে পর পুরুষে চেহারা দেখতে পায়, বরং এর অর্থ হল চেহারার সাথে নেকাব বা কোন কাপড় লাগিয়ে রাখা নিষিদ্ধ। তাদের জন্য এহরামের অবস্থায় পর্দাও করা জরুরী, আবার চেহারায় কোন কাপড় বা নেকাব লাগানোও নিষিদ্ধ। এর উপায় হল তারা চেহারার সাথে লাগতে না পারে এমন কিছু কপালের উপর বেধে তার উপর নেকাব ঝুলিয়ে দিবে। মহিলাগণ এ ব্যাপারে গাফিলতি করে থাকেন, এরূপ করা চাইনা।


এহরাম অবস্থায় যা যা মাকরূহ :

* শরীরের ময়লা পরিষ্কার করা মাকরূহ। 

* চুল বা দাড়ি বা শারীরে সাবান লাগানো মাকরূহ। 

* চুল বা দাড়িতে চিরুনি করা মাকরূহ।

* এমন ভাবে চুলকানো মাকরূহ যাতে চুল, পশম বা উকুন পড়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। এরূপ আশংকা হয় না- এমন আস্তে চুলকানো জায়েয।

* এমন ভাবে দাড়ি খেলাল করা মাকরূহ যাতে দু'একটা দাড়ি খসে পড়ার আশংকা হয়।

* এহরামের কাপড় সেলাই করে বা গিরা কিংবা পিন ইত্যাদি দিয়ে আঁটকানো মাকরূহ, তবে কোমরে বেল্ট বাধা জায়েয। টাকার থলি রাখাও জায়েয ।

* বালিশের উপর মুখ দিয়ে উপুড় হয়ে শয়ন করা মাকরূহ।

* সুগন্ধিযুক্ত খাদ্য যদি পাকানো না হয় তাহলে তা খাওয়া মাকরূহ। পাকানো হলে মাকরূহ নয়।।

* শাহওয়াতের (উত্তেজনার) সাথে স্ত্রীর লজ্জাস্থান দেখা মাকরূহ। 

* নাক গাল কাপড় দিয়ে ঢাকা মাকরূহ, তবে হাত দিয়ে ঢাকা যায় । 

* ইচ্ছাকৃত ভাবে কোন সুগন্ধির ঘ্রাণ নেয়া মাকরূহ। 

* এলাচি, লঙ্গ বা সুগন্ধিযুক্ত তামাকজর্দা সহকারে পান খাওয়া মাকরূহ।


0মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Comment below if you have any questions

Contact form

নাম

ইমেল*

বার্তা*

-->