প্লেটোর সাম্যবাদ কি?
প্লেটোর সাম্যবাদের ভিত্তি হলো তার আদর্শ রাষ্ট্রতত্ত্বের ন্যায়নীতি (Justice)। আড়াই হাজার বছর পূর্বে সাম্যবাদ সম্বন্ধে প্লেটো যা চিন্তা করেছেন আধুনিককালের সমাজতন্ত্রবাদীরা তার সাথে একমত না হলেও তার চিন্তার মৌলিকতা ও যুক্তিযুক্ততায় সকলেই বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়ে ওঠেন।
ন্যায়নীতির ভিত্তিমূলে প্রতিষ্ঠিত প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রে অভিভাবক শ্রেণী কোনরূপ প্রলুব্ধ না হয়ে যেন নিঃস্বার্থভাবে এবং দক্ষতার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করতে ও প্রতিরক্ষা কার্যে নিয়োজিত থাকতে পারেন, সে সাম্যবাদ একান্ত প্রয়োজনীয় মনে হয়। প্লেটো বলেন, সর্বজনীন অভিজ্ঞতায় অনুধাবন করা যায় যে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা একই হস্তে কেন্দ্রীভূত হলে শাসন ব্যবস্থার দক্ষতা ও সততা গুরুতররূপে ব্যাহত হয়। ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে কেন্দ্র করেই সমাজে দেখা দেয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অনৈক্য, কলহ, স্বার্থপরতা এবং হিংসা-দ্বেষ। ফলে রাষ্ট্ৰীয় ঐক্য বিনষ্ট হয়। অন্যপক্ষে, পরিবারিক জীবন সমাজে আনয়ন করে মায়ার বন্ধন। ফলে উত হয় স্বার্থপরতা। ফলে সমাজ অন্যায়, অবিচার ও স্বজনপ্রীতি দ্বারা কলুষিত হয়ে পড়ে।
তাই প্লেটো মনে করতেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পারিবারিক জীবন আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ। সাম্যবাদ প্রবর্তন করে তাই তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পারিবারিক জীবনকে বিলুপ্ত করে ‘আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কর্মসূচী প্রণয়ন করেন। এর বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপঃ | প্রথমত, প্লেটোর সাম্যবাদে ‘আদর্শ রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণী (ruler) এবং সৈনিক শ্রেণীর (warrior) কোনরূপ ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকতে পারবে না। তারা স্বতন্ত্র নিবাসে বসবাস করবেন এবং একই স্থানে আহার গ্রহণ করবেন (They shall live in baracks and have their meals at a common table)। সম্পত্তির কোনরূপ লোত না থাকায় তাঁরা নির্দিষ্ট কর্তব্য ও দায়িত্ব নিঃস্বার্থভাবে বিচক্ষণতা ও দক্ষতার সাথে প্রতিপালনে সক্ষম হবেন।
তাদের ভরণপোষণের ব্যাপারে প্লেটো বলেছিলেন, শাসক শ্রেণীর ভরণপোষণের ব্যয়ভার অবশ্যই রাষ্ট্র বহন করবে। তাদের ব্যয়ভার বহনের জন্য টাকা-পয়সা রাষ্ট্রের উৎপাদক শ্ৰেণী যোগাবে। কারণ, উৎপাদক শ্রেণী ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত নয়।
দ্বিতীয়ত, অভিভাবক শ্রেণীর কোন স্থায়ী এক-পত্নীক যৌন সম্বন্ধ (Permanent monogamous sexual relation) বা কোনরূপ স্থায়ী বৈবাহিক সম্পর্ক থাকবে না। তার পরিবর্তে, শাসক শ্রেণীর নির্দেশক্রমে নিয়ন্ত্রিত জন্মদান ব্যবস্থার ফলে প্রথম, উন্নত ধরনের সন্তান-সন্ততি উৎপাদন সম্ভব হবে। দ্বিতীয়, সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সহজতর হবে। তৃতীয়, সকলেই রাষ্ট্রের সাথে একাত্মতা অনুভব করবে এবং সকলে একই সরে ‘আমার’ বা ‘ঠার' উচ্চারণ করতে অভ্যস্ত হবে না। বরং অত্যন্ত হবে সমস্বরে “আমাদের বলতে। সকলে সমভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিপালিত ও সুশিক্ষিত হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা অর্জন করবে।
প্লেটো তার অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছেন যে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পরিবার পরিজনের প্রতি মানুষের প্রকৃতিগত মায়া তাবত মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে। মানুষ নিজের সন্তান সন্ততি, স্ত্রী, পরিবারপরিজনের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করে। সেজন্য প্লেটো শাসক শ্রেণীকে পরিবারের আওতা থেকে মুক্ত করেন। যৌন ক্ষুধা মেটাবার জন্য তারা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন নারীর সাথে মিলিত হতে পারবেন।
তবে প্লেটোর সাম্যবাদে উৎপাদক শ্রেণীর কোন স্থান নেই। তাদের ক্ষেত্রে এ সাম্যবাদ প্রযোজ্য হবে । তারা ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পারিবারিক জীবন উপভোগ করতে পারবে।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions