রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের গুরুত্ব আলোচনা কর
রাষ্ট্রবিজ্ঞান সামাজিক বিজ্ঞানের অন্যতম প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ শাখা। সুতরাং রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ প্রত্যেকের একান্ত প্রয়োজন।
(১) রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা: এ যুগে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড মানুষের আচার-ব্যবহার, আচরণ ও প্রয়োজন, এমনকি দৈনন্দিন জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রসারিত। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে রাষ্ট্রীয় কর্মের যেন শেষ নেই। শিক্ষা-দীক্ষা, আহার-বাসস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি সাধারণ কার্যগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং রাষ্ট্র বিষয়ে ঔদাসীন্য অন্ধকারের নামান্তর। এই অন্ধকার থেকে মুক্তিলাভ করতে হলে রাষ্ট্রতত্ত্ব সম্বন্ধে প্রকৃত জ্ঞান লাভ একান্ত প্রয়োজন।
(২) রাষ্ট্র ও সমাজজীবন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ জীবনের কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে। এ সত্য বহু পূর্বে গ্রীক দার্শনিকগণ উপলব্ধি করেছিলেন। প্লেটোর (Plato) মতে, “সুবিচার ও বিধি বিধানের আওতা বহির্ভূত মানুষ নিকৃষ্টতম জীব, যদিও পূর্ণতাপ্রাপ্ত হলে মানুষই হয় উৎকৃষ্টতম" ("Man when perfected is the best of animals, but when separated from law and justice, he is the worst of all.")। রাষ্ট্রবিজ্ঞান মানুষকে সমাজ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান দান করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার ফলে মানুষ সমাজকে জানতে পারে। সমাজের প্রতি তার কী কর্তব্য, সমাজে তার কী অধিকার, কী উপায়ে সে অধিকার রক্ষা করা যায় ও কর্তব্য পালন করা যায়, রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, বিধিবিধান কীভাবে জনকল্যাণে নিয়োজিত হচ্ছে--এসব তথ্য সম্বন্ধে আলোকপাত করা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাজ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠ করলে মানুষ শুধু যে নিজেকেই জানতে পারে তা নয়, সমাজে তার স্থান কোথায় এবং কীভাবে সে সামাজিক কল্যাণে অংশীদার হতে পারে, তাও এর দ্বারা নির্দেশিত হয়।
(৩) রাষ্ট্র ও জনকল্যাণ রাষ্ট্র এখন জনকল্যাণে নিয়োজিত। আজ্ঞা কে দেয়, কেন দেয়, কেনই বা তা প্রতিপালিত হয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস কী, কী উপায়ে সকলকে সংযত ও সংহত করে জনকল্যাণের পথে ব্যবহার করা যায়—এসব বিষয়ে অনুসন্ধান করে প্রকৃত তথ্য নির্ণয় করা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাজ। জনসাধারণ যদি এসব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে পরে তাহলে স্বার্থান্ধ ও ক্ষমতালোভীদের হাতে তাদের স্বার্থ কল দিতে হয় না। সর্বজনীন মঙ্গলও শতগুণে বৃদ্ধি পাবে।
(৪) তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ : রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠের ফলে জনসাধারণ কুযুক্তি ও অপসিদ্ধান্তের শিকারে পরিণত হয় না। যুগে যুগে স্বার্থান্বেষীদের দ্বারা অন্যায় ও নীতিবিগর্হিত কার্য সমাধা হয়ে আসছে এবং সর্বক্ষেত্রে জনসাধারণই তার প্রধান শিকার। কিন্তু যে কাজ অন্যায় ও নীতিবহির্ভূত তা রাষ্ট্র বা জাতির নামে সংঘটিত হলেই তা ন্যায়সঙ্গত হয় না। যে প্রলয়ঙ্করী নাৎসীবাদ বিশ্ব সভ্যতাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছিল, তা সব সময়ে পরিত্যাজ্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞান এসব মারাত্মক নীতির কুফল সম্পর্কে জনসাধারণকে সাবধান করে দেয়।
(৫) উদারনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের আর একটি সুফল এই যে তা পাঠককে উদারনৈতিক শিক্ষা প্রদান করে। তাছাড়া, ক্ষমতার উৎপত্তি, ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বিভিন্ন রূপ সরকারের দোষ-গুণ প্রভৃতি আলোচনার মাধ্যমে যুগোত্তীর্ণ মনীষীগণের চিন্তাভাবনার সাথে পরিচিত হলে বুদ্ধিবৃত্তি সুতীক্ষ্ণ হবে এবং নাগরিকগণ স্বীয় কর্তব্য নির্ধারণে উৎসাহী হবে।
(৬)সর্বজনীনতা: বর্তমানে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে এবং প্রযুক্তির জয়যাত্রার ফলে বিজিত হয়েছে দূরত্ব আর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের সকলের সাথে সকলের আত্মীয়তা। বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে কেউ আর বসবাস করে না। সমগ্র বিশ্বের সাথে সকলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই রাষ্ট্রীয় সংগঠন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ যেমন অপরিহার্য তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সংগঠন সম্পর্কে জ্ঞানলাভ আজ অপরিহার্য। বর্তমানে সকলে আমরা পারস্পরিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। বিভিন্ন আদর্শ ও মতবাদের মধ্যে আমাদের সহ-অবস্থানের শিক্ষা লাভ করতে হবে। এ প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জ্ঞান সকলের জন্য অপরিহার্য। তাছাড়া, বিশ্বের বিভিন্ন শাসনব্যবস্থার তুলনামূলক আলোচনা এবং তার মাধ্যমে সকল ব্যবস্থার তুলনামূলক গুণাগুণ আমাদের জন্য এক আশীর্বাদতুল্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞান তার সৃজনশীল | পর্যালোচনার মাধ্যমে আমাদের চিন্তার দিগন্ত বিস্তৃত করতে পারে।
(৭) অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিগদর্শন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান শুধু বর্তমান নিয়েই ব্যস্ত থাকে না। অতীতে রাষ্ট্রের প্রকৃতি কেমন ছিল, বর্তমানে কী অবস্থা চলছে, ভবিষ্যতে তা কোন্ রূপ পরিগ্রহ করবে তা জানা যায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠে। এভাবে অতীতের ভিত্তিতে বর্তমান এবং বর্তমানের সত্তায় ভবিষ্যতের উজ্জ্বল আলোর নিদর্শন লাভ করা যায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুশীলনের মাধ্যমে। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চর্চা যে কোন নাগরিকের জন্য একান্ত কাম্য।
(৮) স্বাধীনতা ও স্বাতলে অলীকার। বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এক রক্তের নদী সঁতরিয়ে বাঙালীরা ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতার লাল গোলাপ ও বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে রয়েছে কৃতসংকল। স্বাধীনতা অর্জন যেমন কষ্টসাধ্য তেমনি এর সংরক্ষণও অত্যন্ত কঠিন। গণতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাও অত্যন্ত জটিল। এজন্য একদিকে প্রয়োজন নাগরিকদের সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মোগ্যতা ও অধিকার রক্ষার সুতীক্ষ্ণ অন্তদৃষ্টি, অন্যদিকে তেমনি প্রয়োজন কর্তব্যবোধের অনুরণন, নাগরিক হিসেবে প্রশিক্ষণ ও জনকল্যাণের অদম্য এক স্পৃহা। বাংলাদেশের নাগরিকগণ রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের মাধ্যমে এ সকল গুণের অধিকারী হতে পারবে ও অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions