রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি ও বিষয়বস্তু
প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল হলো রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যই এর পরিধি। উইলোবীর মতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো : (১) রাষ্ট্র (State), (২) সরকার (Government) এবং (৩) আইন (Law)। অধ্যাপক বারজেস (Burgess) বলেন, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র (Civil Liberty) এবং সার্বভৌম ক্ষমতাই (Sovereignty) রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আসল বিষয়বস্তু। এও উল্লেখযোগ্য যে, এ দুটি বিষয়ের উপর আলোচনা সার্থক হয় যদি তা রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্তর্গত কি কি বিষয় থাকা উচিত, সে সম্বন্ধে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (UNEsco) একটি সম্মেলনে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, নিম্নলিখিত চতুর্বর্গই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্তর্গত। প্রথম, রাষ্ট্রীয় মতবাদ এবং তাদের ইতিহাস; দ্বিতীয়, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও তার অন্তর্গত সংবিধান, জাতীয় সরকার, প্রাদেশিক ও স্থানীয় শাসন প্রণালী ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের তুলনামূলক পর্যালোচনা; তৃতীয়, রাজনৈতিক দল ও উপদল, সরকারি কাজে নাগরিকের অংশগ্রহণ ও জনমত, এবং চতুর্থ, আন্তর্জাতিক বিধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থা।
অনেকের মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান শুধু বর্তমান নিয়েই আলোচনা করে। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। | রাষ্ট্রবিজ্ঞান বর্তমানকে নিয়ে আলোচনা করে তা ঠিক, কিন্তু সাথে সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞান অতীতের গভীরেও
প্রবেশ করে। বর্তমানে রাষ্ট্রের নীতি, সরকারের গঠন প্রণালী, শাসনপদ্ধতির সাথে সম্যক পরিচয় লাভ করতে হলে রাষ্ট্রের অতীত সম্বন্ধেও যথােপযুক্ত জ্ঞানলাভ করতে হবে। রাষ্ট্র কীভাবে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তার সঠিক উপলব্ধির প্রয়োজন। তাই অধ্যাপক লিপসন (Lipson) সত্যই বলেছেন, “কেউ বর্তমানের যথার্থ অর্থ বুঝতে সক্ষম নয় এবং আরও বড় কথা, কেউ ভবিষ্যতের গতি অনুধাবন করতে সক্ষম নয় যদি না সে অতীতে ডুব দেয়” ("One cannot properly grasp the meaning of the present, still less can one chart a course of action for the future without diving into the past.")| আবার অনেকে তর্কের তুফান তুলেছেন এই নিয়ে যে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান শুধু রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। রাজনৈতিক জীবনের ও কার্যাবলির গভীরে প্রবেশ করে নৈতিকতা (values) নিয়ে মাথা ঘামাবে না। কিন্তু অনেক বিজ্ঞজনের মতে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান শুধু ঘটনাবলি নিয়েই ব্যস্ত থাকবে না বরং সাথে সাথে ঘটনাবলির মান নির্ণয়ার্থে ঘটনাক্রমে গভীরেও প্রবেশ করবে। সুতরাং রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেমন ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ ও সিদ্ধান্তের জন্মের কাহিনী বর্ণনা করবে ঠিক তেমনি সমালোচকদের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলির বিশ্লেষণ করে নীতির মানদণ্ডে বিভিন্ন কার্যের যৌক্তিকতা সম্পর্কেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান শুধু নৈর্ব্যক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শুষ্ক আলোচনা করে না, তা প্রত্যেক প্রকারের সামাজিক সংগঠনের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে তাও আলোচনা করবে এবং দিক নিরূপণ করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও সুচিত করবে।
বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনাও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আওতাভুক্ত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং রীতিনীতির মধ্যে গুণাগুণের বিচারে কোনগুলো কাম্য তার অনুসন্ধান পরিচালনাও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাজ। অধ্যাপক রবসন (Robson) তাই বলেন, “রাষ্ট্রবিজ্ঞান শুধু কী আছে তা নিয়েই ব্যস্ত থাকে না, কী হওয়া উচিত তাও নির্ধারণ করে” ("It is concerned both with what it is and what it should be.")। সুতরাং রাষ্ট্রবিজ্ঞান ঘটনার বৈচিত্র্য নিয়ে শুধু আলোচনা করে না, তাদের মূল্যায়নও করে। যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে মানুষ তার মুক্তির সন্ধান করছে। তাই আদর্শ রাষ্ট্রের পদ্ধতি কীরূপ হবে তা মানব মনকে সতত আলোড়িত করেছে।
অধ্যাপক গার্নারের (Garner) উক্তি এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে, “রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে নিজ কক্ষপথে আবর্তন করে। রাষ্ট্র থেকেই এর উৎপত্তি এবং রাষ্ট্রই এর লয়” ("Political Science begins and ends with the state.")। অধ্যাপক গেটেল (Gettell) বলেছেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রধানত তিনটি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করে। প্রথম, রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্র ও তার সংগঠনসমূহের বিশ্লেষণ করে। দ্বিতীয়, রাষ্ট্রের রূপ ও কার্যক্রম অতীতে কেমন ছিল তা পর্যালোচনা করে। তৃতীয়, ভবিষ্যতে তা কী রূপ পরিগ্রহ করবে এবং তার কার্যক্রম কেমন হবে তাও আলোচনা করে। রাষ্ট্রের উৎপত্তি থেকে আরম্ভ করে তার প্রকৃতি, তার উদ্দেশ্য, সাংগঠনিক দিক তথা কার্যাবলি ও মূল্যবোধ সবকিছুই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্র। তাই ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, ভূগোল, দর্শন, এমনকি মনোবিজ্ঞান পর্যন্ত প্রায় সবাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জ্ঞাতিভ্রাতা ও সহযোগী।
এই পৃষ্ঠায় প্রদত্ত রেখাচিত্রে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধির বিবরণ দেয়া হলো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। সংক্ষেপে রাষ্ট্র এবং তার কাঠামো, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় মতবাদ এবং তাদের ইতিহাস, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার তুলনামূলক পর্যালোচনা এবং নীতি নির্ধারণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধির অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া, রাষ্ট্রবিজ্ঞান অন্যান্য বিজ্ঞান ও শাস্ত্রের সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। মূলত রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইতিহাস, দর্শন, আইন শাস্ত্র, অর্থনীতি প্রভৃতির তীর ঘেঁসে অগ্রগতি সাধন করে এবং কালে নিজের স্বাধীনতা ঘােষণা করে।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions