রাষ্ট্রবিজ্ঞান কাকে বলে
বিভিন্ন লেখক বিভিন্নভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা নির্দেশ করেছেন। অত্যন্ত গতিশীল শাস্ত্র বলে এর বিষয়বস্তু সম্বন্ধে লেখকদের মত বদলেছে দিন দিন। রাজনীতি সমাজের মত প্রাচীন, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান তুলনামূলকভাবে নবীন। এই নবীন অধিতব্য বিষয় বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ জীবনের চারিদিক জড়িয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান তার ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছে। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জ্ঞান ব্যতীত আধুনিক সমাজের অনেক মৌল সমস্যা অনুধাবন সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধি সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে হলে এর সংজ্ঞা নির্ধারণ একান্ত প্রয়োজন। তাই বিশিষ্ট লেখকগণের সংজ্ঞা নিচে উদ্ধৃত করে তার একটি চিত্র তুলে ধরতে চেষ্টা করব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আদিগুরু এরিস্টটল (Aristotle) তার রাষ্ট্রসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটিকে ‘রাজনীতি’ (The Politics) বলে আখ্যায়িত করেন এবং রাজনৈতিক কার্যকলাপের বিশ্লেষণকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান' (The | Master Science) বলে চিহ্নিত করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা নির্ধারণ সেই সময় থেকে শুরু হয়। আজও এর কোন সমাপ্তি নেই। পরবর্তীকালে পল জানে (Paul Janet), উইলোবি (W. w. willoughby), | জেলিনেক (Jellinek), সিজউইক (Sidgwick), স্যার ফ্রেডারিক পোলক (Sir Frederick Pollock) প্রমুখ | রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এই গতিশীল শাস্ত্রের বিভিন্ন দিকের উপর গুরুত্ব আরোপ করে বিভিন্নভাবে তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন।
পল জানে (Paul Janet) বলেন, “রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমাজবিজ্ঞানের সেই অংশ যা রাষ্ট্রের মৌল ভিত্তি ও সরকারের নীতিমালা বিশ্লেষণ করে” (“Political Science is that part of social science which analyses the foundations of the state and the principles of government")। এ সম্পর্কে উইলোবির (w. w. willoughby) মতও প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রবিজ্ঞান সেই বিজ্ঞান যার লক্ষ হলো রাজনৈতিক ঘটনাসমূহের চিহ্নিতকরণ এবং তাদের মধ্যে বিদ্যমান যুক্তিবাদী ও কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে ঐ সব ঘটনার সুসমন্বিত বিন্যাস সাধন" ("The Science which has for its object the ascertainment of political facts and arrangement of them in systematic order as determined by the logical and causal relations which exist between them.")|
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেলিনেকের (Jellinek) মতে, “রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রধান কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মৌল সূত্র অনুধাবন, যে সকল অবস্থায় তার অভিব্যক্তি ঘটে ও লক্ষ অর্জিত হয় তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত প্রকৃতির অনুসন্ধান” (“The task of political science is to study in their fundamental relations the public power, to examine the conditions under which they manifest themselves, their end and effects and to investigate the state in its inner nature") | প্রখ্যাত জার্মান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রন্টসলীর (Bluntschli) কথায়, “রাষ্ট্রবিজ্ঞান সেই বিজ্ঞান যার মৌল প্রতিপাদ্য বিষয় রাষ্ট্র, যা রাষ্ট্রের মৌলিক অবস্থা ও অন্তর্নিহিত প্রকৃতি, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রকাশ ও বিবর্তন সম্বন্ধে পর্যালোচনা করে তার স্বরূপ অনুধাবনে সাহায্য করে” (The science which is concerned with the state, which endeavours to understand and comprehend the state in its fundamental conditions, in its essential nature, its various forms of manifestation, and its development.")। প্রসিদ্ধ লেখক ক্যাটলিন (Catlin) বলেন, “রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমাজে মানুষের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ব্যাখ্যা দান করে এবং মানুষের ভিন্নমুখী সামাজিক ভূমিকার বিশদ বিবরণ দান করে” (“Political science deals with political activities of men in society and their different social roles.")।
কোন কোন লেখক আবার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা নির্ধারণের পক্ষপাতী নন। তাদের বক্তব্য—গতিশীল কোন শাস্ত্রকে সংজ্ঞার চার দেওয়ালে আটকানো সম্ভব নয়। কেননা, সংজ্ঞার পরিধি ক্ষুদ্র হলে তা যেমন অসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে, অন্য দিকে বহু ব্যাপক হলেও তা অসংবদ্ধ হয়। অধ্যাপক রবসন (Robson) এ মত পোষণ করেন। তথাপি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা নির্ধারণ অব্যাহত থাকে। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে জার্মান রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এক সম্মেলনে নতুনভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা নির্দেশ করেন। তাদের মতে, “সর্বজনীন জীবনের সমস্যা, ক্ষমতার বিস্তার ও প্রয়োগ সম্পর্কে মতবাদ, বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মের মাধ্যমে মানব সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে আলোচনাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জয়যাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। গত পাঁচ দশকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু ও অধ্যয়ন রীতিতে এমন নাটকীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যা এই শতকের প্রথম দিকে প্রায় অকল্পনীয় ছিল। এ ক্ষেত্রে আমেরিকার রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা নতুনভাবে রাজনীতির সংজ্ঞা নির্দেশ করেছেন, নতুনভাবে বিষয়বস্তুর বিন্যাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তত্ত্ব গঠন ও তার প্রকৃতি, পরিমাপ ও পরিমাপ সূচকের গুরুত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে নতুন দিগদর্শনের ইঙ্গিত দিয়া এ ক্ষেত্রকে আরও উর্বর করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সনাতন ধারণাকে আনুষ্ঠানিক ও সংকীর্ণ বলে তারাই আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, অতীতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান শুধু প্রতিষ্ঠানগত কাঠামো, আইনগত বৈশিষ্ট্য ও রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। বর্তমানে তাই তারা রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামো ও তাদের কার্যাবলি বিশ্লেষণের উপর জোর দিয়েছেন এবং বাস্তবভিত্তিক পর্যালোচনাকে অধিক অর্থপূর্ণ মনে করেন।
এ ক্ষেত্রে এও উল্লেখযোগ্য যে, বর্তমানে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রধানত চারিটি মৌল সূত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। এই চারটি সূত্র হলো : (এক) রাজনৈতিক পর্যালোচনার বৃহত্তর ক্ষেত্র রচনা; (দুই) রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বাস্তবতার সন্ধান;(তিন) সঠিক তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ক্ষেত্রে সুস্পষ্টতার আলো, এবং (চার) বিশ্লেষণ ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের উন্মোচন। এই প্রেক্ষিতে গতানুগতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রাষ্ট্র, সংবিধান, প্রতিনিধিত্ব, নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রভৃতি সনাতন ধারণার পরিবর্তে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান নতুন নতুন ধারণা ও শব্দ ভাণ্ডারে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র (State) বর্তমানে রাজনৈতিক ব্যবস্থা (Political system), রাজনৈতিক কার্যকলাপ (Political functions) রাজনৈতিক ভূমিকা (Political role), পদ (office) কাঠামো (Structure), নাগরিক প্রশিক্ষণ (Citizenship training) রাজনৈতিক দীক্ষাদান (Political socialization) নামে আখ্যায়িত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় এ সব প্রতিফলিত হওয়া বাঞ্চনীয়।
সংক্ষেপে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান যে রাষ্ট্রের বিজ্ঞান (Political Science is the science of the state) এতে কোন সন্দেহ নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান মূলত সেই শাস্ত্র যার মূল বিষয়বস্তু রাষ্ট্র এবং তার কার্যাবলির তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ। কিন্তু যেহেতু এর সদস্যদের কার্যক্রমের মূল নিহিত রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এবং বর্তমান ও অতীতের হাজারো উপাদানে তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঠিক বিশ্লেষণ সব কিছুর প্রেক্ষিতে সম্ভব। এই অর্থে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বর্তমানে এক ব্যাপকভিত্তিক শাস্ত্রে রূপ লাভ করেছে।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions