রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের সম্পর্ক
রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। একে অন্যের উপর নির্ভর করে বেড়ে উঠেছে।
(১) ইতিহাসের সাথে নিবিড় সম্পর্ক ও ইতিহাসকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণাগার বলা হয়। ইতিহাস থেকে জানতে পারা যায় অতীতে কী কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে, ঘটনাবলীর ফল কী হয়েছে ইত্যাদি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এসব প্রয়োজনীয় তথ্যরাজি সগ্রহ করে বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হন এবং অতীতের উপর ভিত্তি করে বর্তমানকে দাঁড় করাতে চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক চিন্তাধারা তিল তিল করে ইতিহাস থেকে সংগৃহীত। লর্ড অ্যাক্টন (Lord Acton) তাই বলেছেন, “ইতিহাসের স্রোতধারায় বালুকণাসমূহের মধ্যে স্বর্ণরেণুর মত রাষ্ট্রবিজ্ঞান জমে উঠেছে" ("The science of politics is the one science that is deposited by the stream of history like the grains of gold in the sands of a river.")
ঐতিহাসিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র গঠন করা হয়েছে। তাই উইলোবী (W, W. willoughby) বলেন, “ইতিহাসই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গভীরতা দান করেছে" (History provides the third dimension to political science.")|
(২) ইতিহাসও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নিকট কম ঋণী নয় । রাষ্ট্রের আইন ও অন্যান্য নীতি সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইতিহাসকে অনেক মাল-মসলা যােগান দেয়। ইতিহাস তারই সাহায্যে ঘটনাবলীর সুসংহত বিবরণ রচনা করতে পারে। ষোল শতকের জাতীয়তাবাদ, সতর শতকের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ, আঠার শতকের গণতন্ত্রায়ন ইতিহাসের ঘটনাসমূহকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে। সুতরাং একটি অপরের উপরে। এমনভাবে নির্ভরশীল যে, দুটিকে নিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি হয়। তাই বার্জেস (Burgess) বলেন, “উভয়কে যদি পৃথক করে দেয়া হয়, তা হলে ইতিহাস মৃত, তা না হলেও হবে বিকলাঙ্গ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান হবে আলেয়ার মত অস্পষ্ট ও অবাস্তব” (“When these two are cut off, history becomes a cripple, if not a corpse and political science is reduced to a will-o-the wisp") arbatpro জন সিলী (Seeley) তাই মন্তব্য করেছেন, ‘ইতিহাসের দ্বারা বিশদভাবে ব্যাখ্যায়িত না হলে রাষ্ট্রবিজ্ঞান হয়ে পড়ে অসার এবং যদি ইতিহাস রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাথে সম্বন্ধ হারায় তা হলে তা মাত্র সাহিত্য পর্যায়ভুক্ত 267 65" ("Politics is vulgar when not liberalised by history and history fades into mere literature when it loses sight of its relation to politics.")
(৩) রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের ক্ষেত্র স্বতন্ত্রকিন্তু এই নির্ভরশীলতা সত্ত্বেও ঐতিহাসিক ফ্রিম্যান | (Freeman) যা বলেছেন তাও গ্রহণযােগ্য। তিনি বলেন, “ইতিহাস শুধু অতীত রাজনীতি নয় এবং অন্যদিকে রাজনীতি শুধু বর্তমান ইতিহাস নয়"। সকল প্রকার ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সম্বন্ধ নেই। স্থাপত্যবিদ্যার ইতিহাস, মুদ্রার ক্রমবিকাশের কাহিনী বা শিল্পকলা, ভাষা, পোশাক-পরিচ্ছেদের ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিন্দুমাত্র সম্বন্ধ নেই।
(৪) রাষ্ট্রতত্ত্বের ভিত্তি সামাজিক সমস্যা ও রাজনীতি বা রাষ্ট্রতত্ত্ব শুধু ইতিহাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। নি। এর মূলে অর্থনৈতিক মনোবৈজ্ঞানিক এবং আইনশাস্ত্রেরও অনেক উপাদান রয়েছে। তাই বার্কার (Barker) বলেছেন, “ঐতিহাসিক পাঠ বাদ দিয়েও ভাল রাষ্ট্রনৈতিক নীতি হতে পারে।” ইতিহাসের ভিত্তিতে গঠিত নয় এমন মতবাদও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিশিষ্ট স্থান দখল করে রয়েছে।—যেমন, প্লেটোর ‘রিপাবলিক' (Republic of Plato)।
(৫) ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরস্পরের পরিপূরক এবং সম্পূরকঃ সিলী (Seeley) আর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে এ সম্পর্কে বলতে চান, “রাষ্ট্রবিজ্ঞান ছাড়া ইতিহাস ফলপ্রসূ নয় এবং ইতিহাস ছাড়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান " ("History without political science has no fruit and political science without history has no root.")। তবে এও সত্য যে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইতিহাসের মত শুধু অতীত এবং বর্তমানেই বাস করে না। ভবিষ্যতের দিকে নজর রেখে রাষ্ট্রবিজ্ঞান আইন ও রাষ্ট্রীয় আদর্শের বহুবিধ সমস্যার সমাধান আনতে ব্যস্ত।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions