রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির সম্পর্ক কি
রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অর্থনীতির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। রাজনীতি অর্থনীতির গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করে। অন্যদিকে অর্থনীতি রাজনীতিকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।
(১) প্রাচীন লেখকগণ অর্থনীতিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শাখা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এমন কী গ্রীক পণ্ডিতগণও এ মত পোষণ করতেন। তাই অর্থনীতিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাথে জড়িত করে বহুদিন একত্রে আলোচনা করেছেন। আঠার শতক পর্যন্ত এ ভাবধারা প্রচলিত ছিল। এ উপমহাদেশেও ১৯৩৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত স্বতন্ত্রভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন প্রচলিত ছিল না। অর্থনীতি বিভাগের একাংশ হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ দেয়া হত। ১৯৩৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পূর্ব পর্যন্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞান ছিল রাজনৈতিক অর্থনীতির (Political economy) অংশবিশেষ। আজকে কেউ দুটিকে একত্র করে ভাবেন না। তবে উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ সম্পর্কে সকলেই সচেতন।
(২) অর্থনৈতিক অবস্থা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে। এটি আধুনিককালে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, অর্থনৈতিক অবস্থা রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। রাষ্ট্র সুপরিকল্পিত আর্থিক পরিকল্পনার (Economic planning) মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি বিধানে মনোযোগী। তার ফলে আর্থিক ব্যাপারে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ খুব বৃদ্ধি পেয়েছে। যেহেতু জনকল্যাণ রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যরূপে গৃহীত, তাই প্রত্যেকটি প্রগতিশীল দেশে রাষ্ট্র বৃদ্ধ, বেকার, অক্ষম ব্যক্তিদের ভরণ-পোষণ, রুগ্নদের সেবা, ছাত্রদের বিনা খরচে লেখাপড়ার সুযোগ দান প্রভৃতির বন্দোবস্ত করছে। এমন কী সরকারের বিভিন্ন রূপ, দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্র এবং কাঠামােকে পর্যন্ত প্রভাবিত করছে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তিগত সম্পত্তি অতি যত্নে সংরক্ষিত হয়েছে। রাষ্ট্রশক্তি যদি দুর্বল হয়, তা হলে নাগরিকগণ আত্মরক্ষার জন্য অধিক শক্তি ব্যয় করতে ব্যস্ত থাকে এবং উৎপাদনে কৃতকার্য হয় না। উৎপন্ন সম্পদ শ্রমিক, পুঁজিপতি, ব্যবসায়ী প্রভৃতি বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে কিভাবে বন্টিত হবে তা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার উপর নির্ভর করবে।
(৩) রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে অর্থনৈতিক অবস্থা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকেও গভীরভাবে নাড়া দেয়। যে দেশে ব্যক্তিগত সম্পত্তি স্বীকৃত হয় না অথবা যেখানে সকল প্রকার উৎপাদনক্ষম উপাদান সমাজের নিয়ন্ত্রণে, সেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গতানুগতিক পথে চলতে সমর্থ হয় না। সেখানে সরকার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সমাজতান্ত্রিক হতে বাধ্য। পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনার দ্বারা যেখানে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত করার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়, সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ও গণঅধিকার স্বল্পকালীন হলেও খর্ব হতে বাধ্য। অতীত ইতিহাসেও এর অনেক নমুনা পাওয়া যায়।
(৪) উভয়ের মধ্যে মিলও প্রচুর : রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির মধ্যে মৌলিক কতকগুলো বিষয়ে প্রচুর মিল রয়েছে। ট্যারিফ আইন (Tariff law), বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতামূলক নিয়মাবলী, শ্রম আইনসমূহ শুধু অর্থনৈতিক কারণে রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও এর শর্তাবলী রাষ্ট্রই নির্ধারণ করে। সর্বোপরি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ও অধিকার সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো নিছক অর্থনৈতিক। সুতরাং অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে সহকর্মী, সহগামী এবং সমাজজীবনের বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান আনয়নে সমানভাবে আগ্রহী।
(৫) অর্থনীতি অধিকতর বাস্তববাদী ও অর্থনীতির অধিকাংশ প্রশ্ন একান্ত বাস্তবধর্মী এবং শুধু বাস্তবতাকে ভিত্তি করে রচিত, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান আদর্শবাদকে ভুলতে পারে না। তাই দর্শন রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে পরিচালিত করে। এ সত্য বহু পূর্বেই উপলব্ধি করেন বহু মনীষী। তাই তারা অর্থনীতিকে ‘শয়তানের শাস্ত্র’ (science of the devil) বলেও আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে অর্থনীতির প্রভাব এড়িয়ে যাবে কে? প্রত্যেকের জীবনমূলে নাড়া দিয়ে অর্থনীতি আপন আসন পাকা করেছে।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions