Protozoa / প্রোটোজোয়া
প্রোটোজোয়া কি
একটিমাত্র প্রকৃত কোষ নিয়ে দেহ গঠিত এমন অতি ক্ষুদ্র প্রাণীদের একটি পর্ব। যদিও নামকরণ থেকে এদের প্রাচীনকালীন প্রাণী বুঝানো হয়, কতক Protozoa (phytoflagellates এবং slime molds) উদ্ভিদ বৈশিষ্ট্য বহন করে। ফলে, তাদের উদ্ভিদ জগতের সদস্য হিসাবে দাবি করা।
ব্যাকটেরিয়ার মতোই প্রোটোজোয়া ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। এদের মুক্তজীবী সদস্যরা মাটিতে, ভিজা বালিতে এবং স্বাদু, মৃদু লবণাক্ত ও লবণাক্ত পানিতে বাস করে। শুকনা মৃত্তিকা বা বালিতে এদের দেখা যায় না। অন্তঃপরজীবী প্রোটোজোয়ানদের বাসস্থানের ব্যাপকতা লক্ষণীয়। কতক অন্তঃকোষীয়, যেমনটি দেখা যায় মেরুদণ্ডী প্রাণীর ম্যালেরিয়া পরজীবীর ক্ষেত্রে। অন্যান্য পরজীবী, যেমন-- Entamoeba histolytica কোষকলা ভেদ করলেও কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে না। অধিকাংশ ট্রাইপ্যানোসোম (trypanosome) মেরুদণ্ডী পোষকের রক্তরসে (blood plasma) বাস করে। অন্যান্য অনেক পরজীবীকে পৌষ্টিক নালির মধ্যে অথবা কখনো কখনো অমেরুদণ্ডী প্রাণীর দেহগহ্বরে বাস করতে দেখা যায়। এমনটি দেখা যায় অনেক গ্রিগারিন-এর (gregarines) ক্ষেত্রেও। অনেক Protozoa-তে একটি মাত্র নিউক্লিয়াস থাকে, কতক দুই অথবা বহু নিউক্লিয়াস বিশিষ্ট। আবার অনেক ক্ষেত্রে জীবন। চক্রের বিভিন্ন দশায় নিউক্লিয়াসের সংখ্যায় তারতম্য হয়। প্রোটোজোয়ার দৈর্ঘ্য ১ থেকে ১০৬ মাইক্রোমিটার। ফ্লাজেলেটস, সিলিয়েটস (ciliates) এবং অনেক Sarcodina কলোনিবদ্ধ হয়ে বাস করে। মূল কোষদেহ এবং প্রজননশীল কোষদেহের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হলেও Protozoa কখনো কলা (tissue) বা অঙ্গ (organ) গঠন করে না।
অঙ্গসংস্থান :
প্রোটোজোয়ানদের দেহ নমনীয় এবং অনেকেই দেহের আকৃতি পরিবর্তন করতে সক্ষম। অনেক সময় দেহকে ঘিরে পেলিকল (pellicle) গঠিত হয় এবং পেলিকল নানান ধাতব পদার্থের সংযোজনে মজবুত প্রকৃতির হতে পারে। Phytormonadina এবং Dinoflagellate-এর মতো প্রোটোজোয়ায় দেহের চারপাশে সেলুলোজের অনুরূপ পদার্থে তৈরি উদ্ভিদকোষের মতো আবরণ গঠিত হতে পারে। বেশ কিছু ডাইনোফ্রাজেলেটদের থিকা অনেকগুলো প্লেটের সমন্বয়ে তৈরি এবং তা নির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজানো। Rhizopoda-এর খোলক (test) সাধারণত অজৈব পদার্থে গঠিত, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জৈব পদার্থের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সিলিকনযুক্ত কঙ্কাল Radiolaria-এর বৈশিষ্ট্য। অনেক ক্ষেত্রে এদের আকার, আকৃতি ও প্রকৃতি আকর্ষণীয়। কোনো কোনো ফ্লাজেলেট এবং সিলিয়েটদের লোরিকা ফুলদানির মতো। কতক সামুদ্রিক সিলিয়েট লোরিকার সাহায্যে সক্রিয়ভাবে সঁতার কাটতে সক্ষম।
সক্রিয় অবস্থায় Mastigophora-তে ফ্লাজেলা থাকে, কতক Sarcodina এবং Sporozoa-তেও এ গঠনের উপস্থিতি দেখা যায়। এটি প্রধানত চলনে সহায়তা করে। দেখতে লম্বা সুতার মতো মনে হলেও অনেক ক্ষেত্রে ফ্লাজেলার কিনারা থেকে দৈর্ঘ্য বরাবর অনুসূত্রের মতো অনেক প্রশাখা গজায়। ফ্লাজেলার চেয়ে অনেক খাটো হলেও প্রোটোজোয়ার আরেকটি অনুরূপ গঠন সিলিয়া, যা Ciliataএর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
কস্ট্রাকশন-হাইড্রলিক (contraction-hydraulic) এবং টু-ওয়ে ফ্লো টাইপ (two-way flow type) নামে দু'ধরনের ক্ষণপদের (pseudopodia) বর্ণনা হয়েছে। প্রথম ধরনের ক্ষণপদ ভোতা, অগ্রভাগ গোলাকার এবং এক্টোপ্লাজম এন্ডোপ্লাজমের চেয়ে গাঢ়। বড় আকারের ক্ষণপদগুলোতে এন্ডোপ্লাজম দানাদার এবং এক্টোপ্লাজম স্বচ্ছ। টু-ওয়ে স্লো ধরনের ক্ষণপদ অতি সূক্ষ্ম সুতার মতো, যা আপাতদৃষ্টিতে আলোকরশ্মির ন্যায় মূল দেহ থেকে চারপাশে বিচ্ছুরিত হয়। এ ধরনের ক্ষণপদ Foraminiferida, অনেক Radiolaria এবং কতক Heliozoa-এর বৈশিষ্ট্য।
নিউক্লিয়াস ছাড়াও প্রোটোজোয়ার বিভিন্ন সদস্যে খাদ্যগহবর, ক্রোম্যাটোফোর, স্টিগমা, এবং অতিরিক্ত পানি দূরীকরণের জন্য বিশেষ ভেসিকলসহ নানা ধরনের অঙ্গাণুর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সাইটোপ্লাজমীয় অঙ্গাণুর মধ্যে মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগী বস্তু, পিনোসাইটিক ভ্যাকিউল (pinocytic vacuole), সঞ্চিত খাদ্যবস্তু, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম, এবং কখনো কখনো নানা প্রকার রঞ্জক দানা উল্লেখযোগ্য।
পুষ্টি :
প্রজাতি ভেদে প্রোটোজোয়ায় পুষ্টি হলোজোয়িক (holozoic) অথবা স্যাপ্রোজোয়িক (saprozoic) ধরনের। প্রথম ধরনে খাদ্যবস্তু সংগৃহীত হয় সক্রিয়ভাবে ক্ষণপদের সাহায্যে অথবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে। স্যাপ্রোজোয়িক পদ্ধতিতে দ্রবীভূত পুষ্টি দেহের উপরিভাগ দিয়ে ব্যাপনের মাধ্যমে সরাসরি সাইটোপ্লাজমে প্রবেশ করে। এ ছাড়া ক্লোরোফিল বহনকারী ফ্লাজেলেটরা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে নিজেদের পুষ্টি নিজেরাই তৈরি করতে সক্ষম। কোষ ভক্ষণ (phagotrophic) প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত খাদ্যবস্তু খাদ্য গহ্বরে পরিপাক হয়। এতে প্রয়ােজনীয় এনজাইমের যোগান দেয় লাইসোসোম। বিভিন্ন প্রজাতিতে পরিপাক ক্রিয়ায় বিস্তর পার্থক্য দেখা গেলেও এ ধরনের পুষ্টি গ্রহণ ও পরিপাক পদ্ধতি Sarcodina, Ciliates এবং অনেক flagellate-এর বৈশিষ্ট্য।
ফুড কাপ (food cup) অথবা গালেট-এর মতো (gulletlike) গঠনের সাহায্যে খাদ্যবস্তু আবদ্ধ করার স্বভাব অর্জন করেছে অনেক Sarcodina, ফ্রাজেলেট এবং অন্তত কয়েকটি Sporozoa-এর প্রজাতি। Foraminiferida এবং Sarcodinaএর কতক সদস্য আঠালো জালের মতো ক্ষণপদের সাহায্যে খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করতে অভ্যস্ত। অনেক সিলিয়েট–এ মুখগহ্বরের মতো স্পষ্ট এক গঠনের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। এতে সিলিয়া এমন সারিবদ্ধভাবে অবস্থান করে যে তার সাহায্যে সংগৃহীত খাদ্যকণা সহজেই সাইটোস্টোম-এ পরিচালিত হয়। সাইটোস্টোম-এর (cytostome) শেষ প্রান্তে সাইটোফ্যারিংক্স-এর (cytopharynx) মাধ্যমে খাদ্যকণা শেষ পর্যন্ত খাদ্যগহবরে বা gastrioles-এ প্রবেশ করে। এ ধরনের গহ্বরেই খাদ্য পরিপাক সম্পন্ন হয়।
পানিতে দ্রবীভূত খাদ্য কর্টেক্স ভেদ করে দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশের যে পদ্ধতি তাই আসলে স্যাপ্রোজোয়িক ধরনের খাদ্য গ্রহণ পদ্ধতি। এ জন্য ব্যাপন প্রক্রিয়া কতটা ভূমিকা রাখে তা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও বিভিন্ন প্রকার সরল চিনি, অ্যাসিটেট এবং বিউটিরেট (butyrate) গ্রহণে ও পরিশোধনে এনজাইমের কার্যকারিতা মুখ্য বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া, বাহ্যিক পরিবেশীয় কিছু উপাদান, যেমন pH, তাপমাত্রা ইত্যাদি ফ্যাটি অ্যাসিড ও ফসফেট গ্রহণে যথেষ্ট প্রভাব রাখে বলে প্রমাণিত হয়েছে।
প্রজনন :
পরিণত বয়সে পৌছেই প্রোটোজোয়া প্রজনন ঘটায়, এবং বিভিন্ন প্রজাতিতে এ সময়কাল আধা-দিবস থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত হতে পারে। এদের সাধারণ প্রজনন পদ্ধতিগুলোর মধ্যে দ্বিবিভাজন (binary fission), বাডিং (budding), প্লাসমোটোমি (plasmotomy), এবং সাইজোগনি (schizogony) উল্লেখযোগ্য। দ্বিবিভাজন পদ্ধতিতে প্রথমত নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয় এবং সে সঙ্গে অন্যান্য অঙ্গাণুর প্রতিলিপন ঘটে। ফলে বিভাজন শেষে দুটি অনুরূপ আকার-আকৃতির প্রোটোজোয়া তৈরি হয়। বাডিং প্রক্রিয়ায় উদ্ভুত দুটি সদস্যের একটি প্রথমত ছোট থাকে। পরে ক্রমে এটি বড় হয়। প্লাসমোটোমিতে বহু নিউক্লিয়াস-বিশিষ্ট প্রোটোজোয়া প্রথমত কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়। এতে প্রতিটি অপত্য কোষে একাধিক নিউক্লিয়াস থাকে। প্রথমদিকে আকারে ছোট দেখালেও ক্রমে এরা পরিণত পর্যায়ে পৌছে। সাইজোগনি sporoz0a-এর বৈশিষ্ট্য; এতে। নিউক্লিয়াসের পৌনঃপুনিক বিভাজনের পর এক-নিউক্লিয়াসবিশিষ্ট ক্ষুদ্র কতকগুলো প্রোটোজোয়ান সৃষ্টি হয়।
সরল প্রকৃতির জীবনচক্রে সক্রিয় দশা (trophic stage) এবং সিস্ট দশা (cyst stage) বর্তমান। তবে কোনো কোনো মুক্তজীবী এবং পরজীবী প্রজাতিতে সিস্ট পর্যায় অনুপস্থিত। অনেক প্রোটোজোয়ায় জীবনচক্রে দুটি সক্রিয় দশার অস্তিত্বও দেখা যায়; কোনো কোনো ক্ষেত্রে বহুরূপতা বর্তমান।
পরজীবী প্রোটোজোয়া :
প্রধান দলগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই। পরজীবী প্রতিনিধি রয়েছে। Sporozoa শ্রেণির সব সদস্যই একান্তভাবে পরজীবী, ফ্লাজেলেটদের বর্গ Trichomondida, Hypermastida এবং Oxymonadida-তে রয়েছে অসংখ্য পরজীবী প্রজাতি। Opalinata, Pyroplasmea, এবং আরো কতক সিলিয়েট বর্গেও অনেক পরজীবী সদস্য অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য আরো। কতক দলে পরজীবী এবং মুক্তজীবী উভয় ধরনের সদস্যই বর্তমান। অনেক Protozoa অন্য প্রোটোজোয়া, কতক ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, এবং শৈবালের পোষক (host)। তুলনামূলকভাবে মাত্র অল্পসংখ্যক প্রোটোজোয়া কার্যত রোগ। সৃষ্টি করে; এদের সৃষ্ট রোগের মধ্যে অ্যামিবিয়াসিস, কালাজ্বর, ঘুমরোগ (sleeping sickness), চ্যাগাস ডিজিস (Chagas disease), ম্যালেরিয়া, গবাদি পশুর টিক ফিভার (tick fever of cattle) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions