বক্সারের যুদ্ধের কারণ
মীর কাশিম বাংলার মসনদে আরোহণ করেই বুঝতে পেরেছিলেন যে ইংরেজদের সাথে ভবিষ্যতে তাঁর সংঘর্ষ সুনিশ্চিত। কারণ মীর কাশিম ছিলেন- মীর জাফরের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। ইংরেজদের সাথে ঝগড়া করার ইচ্ছা তাঁর না থাকলেও ইংরেজদের হাতে ক্রীড়নক হয়ে থাকার মতো হীন মনোবৃত্তি তাঁর ছিল না। তাই তিনি প্রকৃত নবাব হিসেবে দেশ শাসন করতে চেয়েছিলেন। ফলে তিনি দেশ, জাতি ও স্বীয় স্বার্থে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যা বক্সারের যুদ্ধের কারণে পরিণত হয়।
বক্সার যুদ্ধের কারণ গুলো নিম্নরূপ:
১. সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ / রাজধানী স্থানান্তর
দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন বলে সিংহাসনে বসেই মীর কাশিম উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে এদেশে ইংরেজদের রাজনৈতিকহস্তক্ষেপ বন্ধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে তারাই যে এদেশের ভাগ্য বিধাতা হয়ে দাঁড়াবে। রাজধানীতে ইংরেজ রেসিডেন্টের শাসনকার্যে অবৈধ হস্তক্ষেপ স্বাধীনচেতা মীর কাশিমের নিকট অসহনীয় ছিল। তাই প্রশাসনকে ইংরেজ প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন এবং চারপাশে পরিখা-খনন করে ও দুর্গ নির্মাণ করে রাজধানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
মীর কাশিমের মনে হয়েছিল যে ইংরেজরা পুনরায় মীর জাফরকে বাংলার সিংহাসনে বসাতে পারে। সুতরাং তাঁকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়েছিল। তাই ইংরেজদের সম্ভাব্য আক্রমণের মোকাবিলা করার জন্য মীর কাশিম সামরু ও মার্কার নামে দু’জন ইউরোপীয় সৈনিকের সাহায্যে নিজ বাহিনীকে ইউরোপীয় সামরিক পদ্ধতিতে শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করেন। অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাপারে তিনি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ হতে স্বাধীন থাকার জন্য মুঙ্গেরে কামান, বন্দুক ও গোলাবারুদ নির্মাণের ব্যবস্থাও করেন।
বিহারের শাসনকর্তা রামনারায়ণের ইংরেজ প্রীতি ও দুর্নীতি লক্ষ করে মীর কাশিম তাঁকে পদচ্যুত ও তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করলে মীর কাশিমের এ সমস্ত কার্যাবলি ইংরেজদের মনে অসন্তোষ ও সন্দেহের সৃষ্টি করে। ফলে তা যুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দেখা দেয়।
২. বাদশাহী ফরমানের অবমাননা
১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুগল সম্রাট ফররুখ শিয়ার কর্তৃক প্রদত্ত ফরমান বলে কোম্পানি বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে। কিন্তু এ ফরমান অমান্য করে কোম্পানির অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী ‘দস্তক’ নামক ছাড়পত্রে মাল আমদানি বা রপ্তানি বাণিজ্য সংক্রান্ত কথাটি লিখিয়ে বিনা শুল্কে কোম্পানির মাল একস্থান থেকে অন্যস্থানে আনা নেয়া করতো। এ সমস্ত ‘দস্তক' স্বাক্ষরের ভার নবাব কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারির উপর দেন। ফলে দেশীয় বণিকগণ ব্যবসা ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং নবাব নিজেও প্রাপ্য বাণিজ্য শুল্ক হতে বঞ্চিত হতে থাকেন।
৩. অবাধ বাণিজ্যের প্রচলন
অবৈধভাবে এ আন্তঃবাণিজ্য চলতে থাকায় দেশীয় বণিকরা ইংরেজ বণিকদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অসমর্থ হয়। মীর কাশিম এ বিষয়ে গভর্নরের কাছে প্রতিবাদ জানালেন। কিন্তু নবাব প্রতিকার না পেয়ে ইংরেজ ও দেশীয় ব্যবসায়ী। নির্বিশেষে সকল ব্যবসায়ীদের উপর থেকে বাণিজ্য শুল্ক উঠিয়ে দেন। এতে নবাবের রাজস্ব আয় কমে গেলেও দেশীয় বণিকদের সাথে বিদেশি বণিকদের অন্যায় প্রতিযোগিতার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এ নতুন ব্যবস্থার ফলে ইংরেজদের স্বার্থে আঘাত লাগে।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions