দেওয়ানী অধিকার দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কিভাবে
পূর্ববর্তী পাঠে আপনারা জেনেছেন ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা এলাহাবাদ চুক্তি বলে দিউয়ানি লাভ করে। এ সময় লর্ড ক্লাইভ বাংলার গভর্নর হয়ে আসেন এবং এদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এক নতুন দ্বৈত শাসন নীতি প্রবর্তন করেন। দিউয়ানি এবং নিয়ামত-এই দ্বিবিধ শাসন কার্যের দায়-দায়িত্বের ভাগাভাগিকে দ্বৈত শাসন বলে। এই ব্যবস্থা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় ও দেশ রক্ষার ভার থাকে কোম্পানির হাতে; আর নিয়ামত বা বিচার ও প্রশাসন বিভাগের দায়িত্ব থাকে নবাবের উপর। কোম্পানির সরাসরি দিউয়ানির দায়িত্ব গ্রহণে বেশকিছু অসুবিধা ছিল। সরাসরি দিউয়ানি শাসনের জন্য কোম্পানির যে অর্থ ও লোক বল প্রয়োজন তা তাদের ছিল না। উপরন্তু এদেশীয় ভাষা, আইন কানুন সম্পর্কে কোম্পানির কর্মচারীদের জ্ঞান না থাকায় রাজস্ব শাসন সরাসরি গ্রহণ করা ছিল কোম্পানির জন্য বিপদজনক। তা ছাড়া কোম্পানি সরাসরি রাজস্ব গ্রহণ করলে বাংলায় বাণিজ্যরত অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের সাথে সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য। কেননা, বাণিজ্যিক শুল্ক আদায় ছিল দিউয়ানির অন্তর্গত। অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো দেশীয় সরকারকে শুল্ক দিতে রাজী থাকলেও ইংরেজদের শুল্ক দিতে রাজী ছিল না। অতএব ক্লাইভ বুদ্ধি করে দিউয়ানির সমস্ত শাসনভার দেন নবাবের উপর এবং কোম্পানির কাছে রাখেন শুধু কেন্দ্রীয়ভাবে তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা। কোম্পানি ইচ্ছামত রাজস্ব সংগ্রহ করে সম্রাট ও নবাবের ভাতা এবং শাসনকার্যের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রেখে উদ্বৃত্ত অর্থ নিজেরা গ্রহণ করতো। এ ব্যবস্থার ফলে দায়দায়িত্ব ছাড়াই প্রকৃত ক্ষমতা থাকে কোম্পানির হাতে। তাই অন্যভাবে, অতি সহজেই বলা যেতে পারে যে, নবাব পেলেন ক্ষমতাহীন-দায়-দায়িত্ব আর কোম্পানি লাভ করলো দায়িত্বহীন ক্ষমতা।
এতকাল ধরে বাংলার নবাবগণ ছিলেন একাধারে নাযিম ও দিউয়ান। নাযিম হিসেবে তাঁরা শাসন, বিচার ও প্রতিরক্ষার কাজ চালাতেন। আর দিউয়ান হিসেবে তারা রাজস্ব সংগ্রহ করে ব্যয় করতেন। কিন্তু দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় নবাবের ক্ষমতা কমিয়ে তার উপর অনেক দায়িত্ব দেয়া হয়; অথচ অর্থ ও ক্ষমতা ছাড়া দায়িত্ব অর্থহীন। অধিকন্তু, রাজস্ব বিভাগের সঙ্গে ফৌজদারী ও দিউয়ানি বিচার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এতে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে প্রকৃত কর্তৃত্ব কোম্পানির হাতেই থেকে যায়। নবাব অনেক দায়িত্ব বহন করে শুধু বৃত্তিভোগী হিসেবে রয়ে গেলেন।
নবাব নাবালক হওয়ার অজুহাতে ক্লাইভ তার অভিভাবক হিসেবে রাজস্ব বিশারদ সৈয়দ মুহম্মদ রেজা খানকে নিযুক্ত করে নায়েব নাজিম উপাধি দান করেন এবং তাঁর উপর বাংলার রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছেড়ে দেন। অন্যদিকে বিহারের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয় রাজা সেতাব রায়কে। তারা ছিলেন কোম্পানির প্রতিনিধি দিউয়ান। তাঁদের উপাধি দেয়া হয় নায়েব দিউয়ান। কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার্থে তারা রাজস্ব আদায় করতেন এবং কোম্পানির আদেশ মেনে চলতেন। অন্যদিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে তাঁদের উপর নজর রাখার জন্য মুর্শিদাবাদ দরবারে একজন ইংরেজ প্রতিনিধি অবস্থান করতেন। ফলে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় জটিলতার সৃষ্টি হয়। কারণ আদায়কৃত রাজস্ব থেকে শাসনকার্যের সকল ব্যায় মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অর্থ রেজা খানকে কোম্পানির হাতে তুলে দিতে হতো; অথচ রাজস্ব বৃদ্ধির হার বাড়ানো বা কমানোর ক্ষমতা থেকে যেতো কোম্পানির হাতে। ফলে রেজা খানকে এমনি এক উদ্ভুত অবস্থা মোকাবেলা করতে হয় এবং জনসাধারণও এক অমানুষিক দুঃখ-দুর্দশার শিকারে পরিণত হয়। এরই ফলে ১১৭৬ বঙ্গাব্দে (১৭৭০ খ্রি.) বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions