Home » » দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার ফলাফল

দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার ফলাফল

দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার ফলাফল

লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত দ্বৈত-শাসন ব্যবস্থায় সুফলের পরিবর্তে কুফলই দেখা যায় বেশি। দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার কুফল বাংলার শান্তি, স্থিতি ও সমৃদ্ধিকে ধ্বংস করে দেয় এবং বাংলার সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থায় এক চরম দুর্যোগ শুরু হয়। 

প্রথমত: এ ব্যবস্থায় নবাবের দেশ শাসনের দায়িত্ব ছিল বটে; কিন্তু তাঁর কোনো ক্ষমতা ছিল না। অন্যদিকে, কোম্পানির ক্ষমতা ছিল বটে; কিন্তু কোনো দায়িত্ব ছিল না। কর্তৃত্বের এরূপ বিভাগ বাস্তব ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে না। ফলে দেশে | আইন শৃঙ্খলায় অবহেলার দরুন ডাকাতরা গ্রাম-বাংলায় লুঠপাট চালাতে থাকে। নবাব ও কোম্পানি কোনো পক্ষই এদের। শায়েস্তা করার চেষ্টা করেন নি। ফলে গ্রাম-বাংলা জনশূন্য হতে থাকে। 

দ্বিতীয়ত: দ্বৈত-শাসনের ফলে বাণিজ্য কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে অবনতি ঘটে। বাংলার স্বাধীন নবাবী আমলে বহু বিদেশি ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতি এদেশের পণ্য কিনে নিয়ে যেত। কিন্তু কোম্পানির নতুন বাণিজ্য নীতির ফলে এদেশের ব্যবসা ক্ষেত্রে ইংরেজদের একচেটিয়া প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে দেশীয় ও অন্যান্য বিদেশি ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যে মার খান এবং দেশের রপ্তানি আয় সর্ব নিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। কেননা ব্রিটিশ সরকার ইংলন্ডে কমদামী মুর্শিদাবাদী রেশম আমদানি বন্ধ করে দেয়। ইংল্যান্ডের বেশি দামী রেশম শিল্পকে বাঁচাতে। ফলে এদেশীয় কারিগররা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। 

তৃতীয়ত: দ্বৈত শাসন-প্রবর্তনের ফলে, বাংলায় ‘আমিলদারী’-প্রথার উদ্ভব হয়। রেজা খান বিভিন্ন জেলার আমিলদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব তাঁদের হাতে ছেড়ে দিতেন। যেহেতু আমিলদের চাকুরীর মেয়াদ ছিল স্বল্প মেয়াদী সেহেতু তারা যেভাবেই হউক রাজস্ব বেশি করে আদায় করতো। কারণ জেলার যে জমিদার যত বেশি রাজস্ব দিতে পারতো আমিলরা তাদেরকেই রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দিত। এতে করে জমিদাররা ইজারাদারে পরিণত হয়। ফলে বাংলার । জনজীবন আমিলদারী ব্যবস্থায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। 

চতুর্থত: কোম্পানির কর্মচারী গোমস্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা ও অত্যাচারের ফলে দেশের সম্পদ কমতে থাকে এবং পর্যায়ক্রমে ইংল্যান্ডে পাচার হতে থাকে; অথচ রাজস্বের হার প্রতিবছর বাড়তে থাকে। দেখা যায় যে পূর্ণিয়া জেলার বাৎসরিক রাজস্ব যেখানে মাত্র চার লক্ষ টাকা ছিল, সেখানে তা বেড়ে গিয়ে পঁচিশ লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়। এমনিভাবে দিনাজপুর জেলার রাজস্ব বার লক্ষ টাকা থেকে বেড়ে গিয়ে সত্তর লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়। সম্পদের অতিরিক্ত এই রাজস্ব সংগ্রহ করতে রেজা খানের উপর চাপ আসে। ফলে রাজস্ব সংগ্রহ করতে রেজা খানকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। | ফলে অনেক পরগনা হতে রায়তরা আমিলদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অন্য জায়গায় পালিয়ে যায় বা পেশা পরিবর্তন করে।

পঞ্চমত: দিউয়ানি ও দ্বৈত শাসনের চূড়ান্ত পরিণাম ছিল বাংলায় ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের’ ধ্বংসলীলা (১৭৭০ খ্রি. ১১৭৬ বঙ্গাব্দ)। একদিকে দ্বৈত শাসনের দায়িত্বহীনতার ফলে বাংলার জনজীবনে অরাজকতা নেমে আসে, অন্যদিকে অবাধ লুণ্ঠন ও যথেচ্ছভাবে রাজস্ব আদায়ের ফলে গ্রাম্যজীবন ধ্বংস হয়ে যায়। তদুপরি পরপর দু’বছর অনাবৃষ্টি ও খরার ফলে ১১৭৬ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় এক প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ ও মহামারী দেখা দেয়। টাকায় একমণ হতে চাউলের মূল্য বাড়তে বাড়তে টাকায় তিন সেরে এসে দাঁড়ালো। খোলাবাজারের খাদ্যশস্য বেশি লাভের আশায় কোম্পানির কর্মচারীরা মজুদ করা শুরু করে। ফলে খাদ্যের অভাবে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। দলে দলে লোক খাদ্যের আশায় কলকাতা, ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের দিকে ছুটে আসে। এই সময়েও খাজনা মওকুফ করা হয় নি। 

ইংল্যান্ডের কৃষ্ণ মড়কের মতো ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ছিল ভয়ঙ্কর সর্বনাশা। ফলে গ্রাম-বাংলা জনশূন্য হয়। এই দুর্ভিক্ষে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ জেলাগুলো ছিল নদীয়া, রাজশাহী, বীরভূম, বর্ধমান, যশোহর, মালদহ, পূর্ণিয়া ও চব্বিশ পরগণা। বরিশাল, ঢাকা, ফরিদপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে বিশেষ ফসলহানি না হওয়ায় দুর্ভিক্ষের প্রকোপ তেমন একটা ছিল না। তাছাড়া ‘নাজাই' প্রথার প্রকোপ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য কৃষকেরা ভিটে মাটি ছেড়ে পালায়। 'নাজাই প্রথার অর্থ ছিল, কোনো একজন রাজস্ব বাকী ফেললে সেই গ্রামের অন্য কৃষকদের সেই রাজস্ব দিতে হতো। মন্বন্তরের ফলে বহু কৃষক মারা পড়ায় তাদের বকেয়া রাজস্বের দায়িত্ব জীবিত কৃষকদের উপর বর্তায়। এই দায়িত্ব বইতে না পেরে বহু কৃষক জমির স্বত্ব ছেড়ে পাইকে পরিণত হয়। সামগ্রিকভাবে কৃষির অবনতি ও অনাবৃষ্টির ফলে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ ১১৭৬ বঙ্গাব্দে দেশে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তা ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' নামে পরিচিত। এ দুর্ভিক্ষের চিহ্ন বাংলায় প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল।

দুর্ভিক্ষের এক পরোক্ষ ফল দিউয়ানি শাসনের অবসান ঘটে। কোম্পানির রাজস্বের আয়-কমে যায়। বাণিজ্যেরও মন্দা দেখা দেয়। তাই কোম্পানির স্বার্থ রক্ষার জন্য ও বাংলার কৃষি শিল্পকে রক্ষার জন্য বিলাতের পরিচালক সভা দ্বৈত শাসন লোপ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ওয়ারেন হেস্টিংসকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, এখন থেকে কোম্পানি যেন বাংলার রাজস্ব ও শাসনের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব গ্রহণ করে। 

ক্লাইভের এই দ্বৈত শাসন ব্যবস্থায় একটি ভাল দিক ছিল এই যে, এটা মোগল শাসন ব্যবস্থাকে অটটু রাখে। প্রথমে কোম্পানির কর্মচারীরা রাজস্ব ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করে নি। অন্তত ক্লাইভ যতদিন কোলকাতা ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর ছিলেন ততদিন রেজা খান কৃতিত্বের সাথে মুগলী প্রথায় শাসনকার্য পরিচালনা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে ক্লাইভ স্বদেশে ফিরে গেলে তার দ্বৈত ব্যবস্থায় ফাটল ধরে।

0মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Comment below if you have any questions

Contact form

নাম

ইমেল*

বার্তা*

-->