Home » » গিয়াসউদ্দিন বলবন

গিয়াসউদ্দিন বলবন

গিয়াসউদ্দিন বলবন

গিয়াসউদ্দিন বলবন ছিলেন সুলতান ইলতুৎমিশের (১২১১-১২৩৬ খ্রি.) কনিষ্ঠ পুত্র সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদের (১২৪৬-১২৬৬ খ্রি.) শ্বশুর। গিয়াসউদ্দিন বলবন তুর্কিস্তানের বিখ্যাত ইলবারি গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। বলবনের প্রকৃত নাম ছিল বাহাউদ্দিন। বলবন এবং উলুঘ খান এ দু'টো ছিল তাঁর উপাধি। বলবনের রাজ উপাধি ছিল গিয়াসউদ্দিন। শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশের ন্যায় গিয়াসউদ্দিন বলবন যৌবনেই দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হন। বাগদাদের খাজা জামালউদ্দিন বসরী নামক জনৈক ব্যক্তির নিকট মোঙ্গলরা গিয়াসউদ্দিন বলবনকে বিক্রি করে দেন। খাজা জামাল উদ্দিন নিজেও ছিলেন একজন দাস ব্যবসায়ী। ১২৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি অন্যান্য দাসদের সাথে গিয়াসউদ্দিন বলবনকেও দিল্লিতে নিয়ে আসেন এবং দিল্লির তৎকালীন সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশের নিকট বিক্রি করে দেন। প্রখর মেধা এবং ধীশক্তি সম্পন্ন গিয়াসউদ্দিন বলবন অচিরেই তাঁর নানামুখী প্রতিভাবলে সুলতান ইলতুৎমিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সুলতান ইলতুৎমিশ গিয়াসউদ্দিন বলবনকে তাঁর ইতিহাস প্রসিদ্ধ বিখ্যাত 'বন্দেগান-ই-চেহেলগান' বা 'চল্লিশ চক্রের' অন্তর্ভুক্ত করেন। বলবন ছিলেন সুলতান ইলতুৎমিশের ‘খাসবরদার' বা ব্যক্তিগত কর্মকর্তা।


সুলতান রাজিয়ার (১২৩৬-১২৪০খ্রি.) শাসনামলে বলবন ছিলেন আমির-ই-শিকার। সুলতান ইলতুৎমিশের পুত্র মুইজউদ্দিন বাহরামের সময় বলবন যথাক্রমে রেওরী এবং হাসীর ভূস্বামীর দায়িত্ব পালন করেন। মুইজউদ্দিন বাহরামের সময় তিনি ‘আমির-ই-হাযীব’ (রাজগৃহাধ্যক্ষ) পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। সুলতান আলাউদ্দিন মাসুদের (১২৪২-১২৪৬) শাসনামলেও বলবন ‘আমির-ই-হাযিব' পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। গিয়াসউদ্দিন বলবনের প্রভাব প্রতিপত্তি মূলত: বৃদ্ধি পায় সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদের (১২৪৬-১২৬৬ খ্রি.) শাসনামলে সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদের সময় পাঞ্জাবে মেঙ্গু খানের নেতৃত্বে মোঙ্গলরা উপদ্রব শুরু করলে গিয়াসউদ্দিন বলবন কঠোর হস্তে এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই বিদ্রোহ দমন করেন। নাসির উদ্দিন মাহমুদ গিয়াসউদ্দিন বলবনকে ‘উলুঘ খান' উপাধিতে ভূষিত করেন। ১২৪৯ খ্রিস্টাব্দে গিয়াসউদ্দিন বলবন ‘নায়েব-ই-মামলিকাত' পদে নিযুক্ত হন এবং সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে নিজ কন্যার বিবাহ প্রদান করেন। নাসির উদ্দিন মাহমুদের দুর্বলতার সুযোগে শ্বশুর গিয়াসউদ্দিন বলবন প্রকৃত সুলতানের ক্ষমতা চর্চা করতেন এবং অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ বিদ্রোহ দমন করে সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব বিধান করেন। বলবনের জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাত পরিলক্ষিত হয়। যেমন: ১২৫৩ খ্রিস্টাব্দে ইমাম উদ্দিন রায়হান নামক জনৈক প্রভাবশালী আমিরের নেতৃত্বে তুর্কি আমিরদের ষড়যন্ত্রের কারণে বলবন ক্ষমতাচ্যুত হলেও ১২৫৪ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় পূর্বপদে অধিষ্ঠিত হয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হন। গিয়াসউদ্দিন বলবন ১২৪৯ ও ১২৫৭ খ্রিস্টাব্দে যথাক্রমে মুলতান ও অযোধ্যার বিদ্রোহ দমন করে শান্তি স্থাপন করেন। তিনি দুর্ধর্ষ মোঙ্গলদের আক্রমণ হতে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং বাংলা ও বিহারের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। কালিঞ্জর ও গোয়ালিয়রের হিন্দু নরপতি এবং মেওয়াটের উপজাতিদের বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করে বলবন দোয়াবে শান্তি স্থাপন করেন। এভাবে গিয়াসউদ্দিন বলবন সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদের শাসনামলে দিল্লি সালতানাতের প্রকৃত শাসন-ক্ষমতা ভোগ করেন।


বলবনের সিংহাসনে আরোহণ

সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদের (১২৪৬-১২৬৬ খ্রি.) কোনো সন্তান ছিল না। তিনি ছিলেন সুলতান ইলতুৎমিশের সর্বশেষ সন্তান। ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর পূর্বে সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ তাঁর শ্বশুর গিয়াসউদ্দিন বলবনকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২০ ফেব্রুয়ারি বলবন ৬০ বছর বয়সে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণে করেন। তিনি সালতানাতের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি বলতেন, রাজা হচ্ছেন আল্লাহর প্রতিনিধি। তিনি রাজার দৈবসত্ত্বায় বিশ্বাস করতেন। বলবন ‘জিল্লুল্লাহ' উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি সালতানাতের প্রতি জন সাধারণের শ্রদ্ধা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে রাজদরবারে পারসিক রীতির প্রবর্তন করেন।


বিদ্রোহ দমনে কঠোর নীতি অবলম্বন

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন সাম্রাজ্যে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতাবাদ, গোলযোগ ও বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা নির্মূল করার উদ্দেশ্যে এক অভিনব ও নির্মম নীতি অবলম্বন করেন। সুলতান কর্তৃক গৃহীত এই নীতি ইতিহাসে ‘রক্তপাত ও কঠোরতার নীতি' (Blood and Iron Policy) নামে পরিচিত। সুলতান ইলতুৎমিশ তাঁর বিশ্বস্ত ও সুযোগ্য চল্লিশজন ক্রীতদাসকে নিয়ে বিখ্যাত ‘বন্দেগান-ই-চেহেলগান' বা চল্লিশ চক্র গঠন করেছিলেন। বলবন নিজেও ছিলেন এই দলের একজন সদস্য। কিন্তু তিনি সুলতান হওয়ার পর এই চক্র তাঁর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সুলতান বলবন এই চল্লিশ চক্রের প্রভাব হ্রাস করার জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যেমন, প্রথমত: তাদের বিশেষ সুযোগ সুবিধা বাতিল করা, দ্বিতীয়ত: তাদের বল্গাহীন স্বাধীনতা রহিত করা, তৃতীয়ত: তাদের মধ্যে অবাধ মেলামেশা বন্ধ করা, চতুর্থত: রাজদরবারে তাদের হাসি-ঠাট্টা নিষিদ্ধ করা এবং পঞ্চমত: তাদের প্রদেয় জায়গীরদারি বাতিল করা। এমনকি সামান্য অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধানও প্রয়োগ করেন। আমির খান, হায়বৎখান এবং বরবকসহ বহু প্রভাবশালী অভিজাতকে তিনি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন । তিনি আপন চাচাতো ভাই ও চল্লিশ চক্রের অন্যতম সদস্য শেরখানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন ছিলেন স্বেচ্ছাচারী এবং আধিপত্যবাদী স্বৈরশাসক। তার স্বৈরশাসন নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রয়োগের জন্য সাম্রাজ্যের সর্বত্র গুপ্তচর নিয়োগ করেন। অত্যন্ত চৌকস, অনুগত এবং বিশ্বস্ত এসব গুপ্তচরেরা সমস্ত গোপন সংবাদ সুলতানকে সরবরাহ করত এবং শাসন ব্যবস্থা নির্বিঘ্নে পরিচালনায় সহযোগিতা প্রদান করত। অভ্যন্তরীণ এবং বহিঃস্থ গোলযোগ ও বিদ্রোহ দমন করার জন্য সুলতান বলবন সামরিক বাহিনীকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে গড়ে তুলেন।


মেওয়াটি দস্যুদের দমন

 দুধর্ষ মেওয়াটি দস্যুরা ছিল মেওয়াট বা আলোয়ারের পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসী। এই রাজপুত মেওয়াটি দস্যুগণ প্রকাশ্যে দিল্লির রাজপথে পথিকদের সবকিছু লুঠ করে নিয়ে যেত। সুলতান বলবন দিল্লির উপকণ্ঠ থেকে এসকল দস্যুদের বিতাড়িত করেন এবং তাদের অনেককে হত্যা করেন। সুলতান নিজেই মেওয়াটি দস্যুদের প্রধান ঘাঁটি কাম্পিল, পাতিয়ালী, ভোজপুর প্রভৃতি স্থানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। মেওয়াটি দস্যুদের ভবিষ্যত আক্রমণ থেকে দিল্লিকে রক্ষার জন্য সুলতান বলবন গোপালগীরের দুর্গ নির্মাণ করেন এবং জালালী দুর্গটি সংস্কার করেন।

 

বাংলার বিদ্রোহ দমন

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন যখন ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধে ব্যস্ত সেই সুযোগে বিদ্ৰোহ প্রবণ বাংলার শাসক তুঘরিল খান ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির শাসন অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তুঘরিল ‘সুলতান মুঘিস উদ্দিন' উপাধি ধারণ করে সার্বভৌমত্বের প্রতীক স্বরূপ খুতবা পাঠ ও মুদ্রা জারি করেন ।


বলবনের মোঙ্গল নীতি

সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের শাসনামলে (১২৬৬-১২৮৭খ্রি.) ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মোঙ্গল আক্রমণ শুরু হয় । মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তিনি সেনাবাহিনীকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে পুনর্গঠিত করেন। সামরিক ঝুঁকিপ্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন নতুন দুর্গনির্মাণ এবং পুরাতন দুর্গগুলোর সংস্কার সাধন করেন। সুলতান বলবন সামানা, মুলতান এবং দিপালপুরকে একত্রিত করে সীমান্তবর্তী প্রদেশ গঠন করেন এবং সুযোগ্য শাসনকর্তাদের উপর সেগুলোর শাসনভার অর্পণ করেন। সুলতান বলবন সর্বদা রাজধানীতেই অবস্থান করার উদ্দেশ্যে দূরবর্তী অঞ্চলে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখেন ।


সুলতান বলবন অযোধ্যার শাসক আমিন খান, সেনানায়ক মালিক তারঘি ও শাহাব উদ্দিনের নেতৃত্বে উপর্যুপরি তিনবার বাংলায় অভিযান প্রেরণ করেন। কিন্তু সেগুলো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বাধ্য হয়ে সুলতান বলবন স্বয়ং তাঁর দ্বিতীয় পুত্র বুঘরা খানকে সঙ্গে নিয়ে বাংলা অভিযানে অগ্রসর হন। বাংলার বিদ্রোহী শাসক তুঘরিল খান বলবনের বিশাল বাহিনীর আগমনের সংবাদে রাজধানী লক্ষণাবতী থেকে পলায়ন করে সোনারগাঁও এ আশ্রয় গ্রহণ করেন। শেষ পর্যন্ত তুঘরিল খান বলবনের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন (১২৮১ খ্রি.)। বলবন বুঘরা খানকে প্রয়োজনীয় উপদেশ প্রদান করে বাংলার শাসক নিয়োগ করেন ।


মুলতান ও দিপালপুরের প্রথম শাসনকর্তা ছিলেন শের খান। তার মৃত্যুর পর বলবন তাঁর প্রথম পুত্র মুহম্মদকে মুলতান ও দিপালপুরের এবং দ্বিতীয় পুত্র বুঘরা খানকে সামানা ও সুসানের শাসক নিযুক্ত করেন। ১২৭৯ খ্রিস্টাব্দে দুর্ধর্ষ মোঙ্গলগণ শতদ্রু নদী পার হয়ে নৃশংসতা আরম্ভ করলে যুবরাজ মুহম্মদ ও বুঘরা খান এবং মালিক মোবারকের যৌথ আক্রমণে মোঙ্গলদের পরাজয় ঘটে। তবে সেনাপতি তামারের নেতৃত্বে মোঙ্গলগণ ১২৮৬ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাব আক্রমণ করলে যুবরাজ মুহাম্মদ তাদের সাথে সংঘঠিত এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত হন। শেষ পর্যন্ত বলবনের সৈন্যবাহিনী মোঙ্গলদের বিতাড়িত করে লাহোর পুন:দখল করেন। ১২৮৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে বলবন বাংলার শাসক দ্বিতীয় পুত্র বুঘরা খানকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করতে চাইলেও তিনি অসম্মতি জ্ঞাপন করায় বলবন যুবরাজ মুহম্মদের পুত্র কায়খসরুকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন।

0মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Comment below if you have any questions

Contact form

নাম

ইমেল*

বার্তা*

-->