আলাউদ্দিন খলজি / আলাউদ্দিন খিলজি
সুলতান আলাউদ্দিন খলজি ছিলেন মুসলিম ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী ও সফল শাসক। তিনি ছিলেন খলজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান জালালউদ্দিন ফিরোজ খলজির ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা। তাঁর বাবার নাম ছিল শাহাবউদ্দিন । পিতৃ বিয়োগের পর আলাউদ্দিন খলজি পিতৃব্য জালাল উদ্দিন ফিরোজের স্নেহে লালিত পালিত হন এবং যুদ্ধবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। পিতৃব্য জালালউদ্দিন সিংহাসনারোহণ করে আলাউদ্দিনকে ‘আমীরে তুজুক' পদে অধিষ্ঠিত করেন। আলাউদ্দিন খলজি কারা প্রদেশ এবং অযোধ্যায় শাসকের পদও অলংকৃত করেন। ১২৯৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি দেবগিরিতে অভিযান পরিচালনা করে প্রচুর ধন-রত্ন হস্তগত করেন। ১২৯৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯শে জুলাই আলাউদ্দিন খলজি নিজ পিতৃব্য ও শ্বশুর জালালউদ্দিন ফিরোজকে হত্যা করে নিজেকে দিল্লির সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন ।
বিজেতা হিসেবে আলাউদ্দিন খলজি
গ্রীক বীর আলেকজান্ডারের ন্যায় সুলতান আলাউদ্দিন খলজি ছিলেন একজন সাম্রাজ্যবাদী সমরনায়ক। তিনি নিজে মুদ্রায় দ্বিতীয় আলেকজান্ডার উপাধিও গ্রহণ করেছিলেন। ডব্লিউ হেগ-এর মতে, “আলাউদ্দিনের রাজত্বকাল হতেই দিল্লি সালতানাতের যুগ শুরু হয় এবং অর্ধ শতাব্দির বেশীকাল তা বলবৎ ছিল।” সুলতান আলাউদ্দিন খলজি ১২৯৭ খ্রি. থেকে ১৩০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে উত্তর ভারতের গুজরাট রণথম্ভোর, মেবার, মালব, উজ্জয়িনী, ধর, চান্দেরীসহ এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে তাঁর আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। অন্যদিকে, ১৩১২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রামেশ্বর সেতু পর্যন্ত দাক্ষিণাত্যের এক বিশাল অঞ্চলের উপর নিজ কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।
উত্তর ভারতে রাজ্য বিস্তার:
গুজরাট অভিযান
১২৯৭ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি নিজ ভ্রাতা উলুঘ খান এবং মন্ত্রী নুসরাত খানকে গুজরাট অভিযানে প্রেরণ করেন। গুজরাটের তৎকালীন রাজা ছিলেন দ্বিতীয় রায় কর্ণদেব। সুলতানের বাহিনীর আক্রমণে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে রাজা রায় কর্ণদেব তার কন্যা দেবলাদেবীকে নিয়ে দাক্ষিণাত্যের দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র দেবের রাজপ্রাসাদে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সুলতানের বাহিনী রাজধানী আনহিলওয়ারাসহ সমগ্র গুজরাট ও ক্যাম্বে হস্তগত করেণ। রানী কমলাদেবীসহ কাফুর নামক একজন খোজাকে বন্দি করে দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি রানী কমলাদেবীকে বিবাহ করেন। আর খোজা কাফুর-পরবর্তীতে মালিক কাফুর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনি আলাউদ্দিন খলজির প্রধান সেনাপতি ও অমাত্যের পদ অলংকৃত করেন ।
রণথম্ভোর বিজয়
দিল্লির দুর্বল শাসকদের অযোগ্যতার সুযোগে রাজপুতগণ পুনরায় রণথম্ভোর দখল করে নেয়। এই সময় রণথম্ভোরের শাসক ছিলেন দ্বিতীয় চৌহানরাজ হামির দেব। সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী মুহাম্মদ শাহসহ অনেক নব মুসলমানকে তার রাজ্যে আশ্রয় প্রদান করে হামির দেব সুলতান আলাউদ্দিন খলজির বিরাগ ভাজন হন। আলাউদ্দিন ১২৯৯ খ্রিস্টাব্দে উলুঘ খান ও নুসরাত খানের নেতৃত্বে অভিযান প্রেরণ করলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এরপর সুলতান নিজে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে রণথম্ভোরের উদ্দেশ্যে যুদ্ধযাত্রা করেন। সুলতানের বাহিনী দীর্ঘ এক বছর রণথম্ভোর অবরোধ করে রাখার পর ১৩০১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে রণথম্ভোর দুর্গ জয় করে নেয়। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি রাজা হামির দেবকে সপরিবারে হত্যা করেন। নব-মুসলমানদেরকেও হত্যা করা হয়। সুলতান তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি উলুঘ খানকে রণথম্ভোরের শাসক নিযুক্ত করেন এবং বিপুল ধন রত্ন সহকারে রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন ।
চিতোর বিজয়
রাজপুতনার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্য ছিল মেবার। আর মেবারের রাজধানী চিতোর ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং দুর্ভেদ্য। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট আলাউদ্দিন খলজি স্বয়ং এক বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে চিতোর আক্রমণ করেন। রাজপুত রাণা রতন-সিংহের পদ্মিনী নামে এক অনিন্দ্য সুন্দরী পত্নী ছিল। জনশ্রুতি আছে যে, পদ্মিনীকে লাভের জন্য সুলতান আলাউদ্দিন খলজি মেবার অভিযান করেন। কিন্তু ইতিহাসবিদেরা পদ্মিনী উপাখ্যানের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন। উভয় বাহিনীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে রাজপুত বীর গোরা ও বাদল বীরত্ব প্রদর্শন করা সত্ত্বেও রাণা রতন সিংহ রাজকীয় বাহিনীর হাতে পরাজিত এবং বন্দী হন। রাজপুত রমনীগণ আত্মসম্ভ্রম রক্ষার্থে জলন্ত অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন দেন। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এই প্রথা ‘জহরব্রত' নামে পরিচিত ছিল । আলাউদ্দিন খলজি তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র খিজির খানকে চিতোরের শাসনভার অর্পণ করেন। যুবরাজ খিজির খানের নামানুসারে চিতোরের নামকরণ করেন খিজিরাবাদ। ১৩১১ খ্রিস্টাব্দে যুবরাজ খিজিরখান চিতোর ত্যাগ করলে সুলতান জালোরের অধিপতি মালদেবকে চিতোরের শাসক নিয়োগ করেন। ১৩১৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি মৃত্যুবরণ করেন। ১৩১৮ খ্রিস্টাব্দে চিতোরের শাসক মালদেবকে বিতাড়িত করে রাজপুত রাণা হামির চিতোর পুনঃদখল করেন।
মালব বিজয়
উত্তর ভারতের গুজরাট, রণথম্ভোর ও চিতোর বিজয়ের পর সুলতান আলাউদ্দিন খলজি মালব বিজয়ে অগ্রসর হন। এসময় মালবের শাসক ছিলেন রায় মাহল দেব। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি ১৩০৫ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি আইন-উল-মুলককে সেনাবাহিনীসহ মালবের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। রাজকীয় বাহিনীর সাথে রায় মাহল দেবের বাহিনীর এক তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে রায় মাহল দেব পরাজিত ও নিহত হন। এরপর উজ্জয়িনী, চান্দেরী, মান্ডু, ধর প্রভৃতি অঞ্চল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। সুলতান আলাউদ্দিন বিজয়ী সেনাপতি আইন-উল-মুলককে মালবের শাসক নিযুক্ত করেন। ১৩০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সমগ্র উত্তর ভারতে সুলতান আলাউদ্দিন খলজির আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
আলাউদ্দিন খলজির দক্ষিণ ভারত বিজয়
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য,ধনরত্নের প্রাচুর্য এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ প্রভৃতি সুলতান আলাউদ্দিন খলজিকে দক্ষিণ ভারত তথা দাক্ষিণাত্য বিজয়ে উৎসাহিত করে। দাক্ষিণাত্য অভিযানে সুলতান আলাউদ্দিন খলজির প্রধান সমর নায়ক ছিলেন মালিক কাফুর।
দেবগিরি অভিযান
সুলতান আলাউদ্দিন খলজির শাসনামলে দেবগিরির শাসক ছিলেন রাজা রামচন্দ্র দেব। রামচন্দ্র দেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইলিচপুর প্রদেশের কর প্রেরণ করেননি এবং সুলতানের নিকট উপঢৌকন প্রেরণ বন্ধ করে দেন। তবে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল যে, তিনি গুজরাটের পরাজিত রাজা কর্ণদেবকে তাঁর কন্যা দেবলা দেবীসহ আশ্রয় প্রদান করেন। সুলতান আলাউদ্দিন ১৩০৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সেনাপতি মালিক কাফুরকে দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র দেবের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। রাজা রামচন্দ্র দেব সুলতানের বাহিনীর নিকট পরাজিত হন এবং বশ্যতা স্বীকার করেন। তার এরূপ ব্যবহারে খুশী হয়ে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি রাজা রামচন্দ্র দেবকে ‘রায়-রায়ন' উপাধি প্রদান করেন। সেনাপতি মালিক কাফুর বিপুল ধন সম্পদসহ গুজরাটের রাজকন্যা দেবলা দেবীকে নিয়ে রাজধানী দিল্লিতে প্রত্যাবর্তন করেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র খিজির খানের সাথে দেবলা দেবীর বিবাহ প্রদান করেন ।
বরঙ্গল বিজয়
‘বরঙ্গল’ ছিল তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী। বরঙ্গলে এসময় কাকতীয় বংশের শাসন প্রচলিত ছিল। কাকতীয় বংশের শাসক রাজা দ্বিতীয় প্রতাপরুদ্র দেবের বিরুদ্ধে ১৩০৮ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন সেনাপতি মালিক কাফুরকে প্রেরণ করেন। প্রায় দুই বছর অবরুদ্ধ থাকার পর ১৩১০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে রাজা দ্বিতীয় প্রতাপরুদ্র দেব সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করেন। রাজা সুলতানের জন্য বিপুল উপঢৌকন প্রেরণ করেন এবং বাৎসরিক কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন।
দেবগিরি এবং বরঙ্গল রাজ্য বিজয়ের পর আলাউদ্দিন খলজি দাক্ষিণাত্যের শেষ সীমা পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন।
দ্বার সমুদ্র বিজয়
দাক্ষিণাত্যের হোয়সলরাজ তৃতীয় বীর বল্লালের রাজধানী ছিল দ্বার সমুদ্র। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি ১৩১০ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত সেনাপতি মালিক কাফুর এর নেতৃত্বে এক বিশাল সেনাবাহিনী তৃতীয় বীর বল্লালের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন । সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মিত্র দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র, বরঙ্গলের রাজা দ্বিতীয় প্রতাপরুদ্র দেব এবং মালিক কাফুরের নেতৃত্বে সুলতানের বাহিনী সম্মিলিতভাবে হোয়সলরাজকে আক্রমণ করলে রাজা বীর বল্লাল অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হয়ে যুদ্ধের সমস্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন এবং সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করেন। ফলে হোয়সল রাজ্য দিল্লির সালতানাতের সরকারের অধীনস্ত হয় এবং নিয়মিত করদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে।
পান্ডরাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান
দ্বার সমুদ্রের দক্ষিণে অবস্থিত পান্ডরাজ্যের রাজধানী ছিল মাদুরা। পান্ডরাজ্যের রাজার মৃত্যুর পর বীর পান্ড ও সুন্ড পান্ডের মধ্যে ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ১৩১১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি সেনাপতি মালিক কাফুরকে পান্ডরাজ্যের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। ভ্রাতৃবিরোধের সুযোগে মালিক কাফুর অতিসহজেই পাণ্ডরাজ্য অধিকার করেন। সেনাপতি কাফুর রামেশ্বর পর্যন্ত দখল করেন। তিনি রামেশ্বরে সুলতান আলাউদ্দিন খলজির নামানুসারে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৩১১ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে মালিক কাফুর বিপুল ধনসম্পদসহ দিল্লিতে প্রত্যাবতন করেন ।
শংকর দেবের বিরুদ্ধে অভিযান
দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র দেব ছিলেন দিল্লি সালতানাতের প্রতি বিশেষভাবে অনুগত। ১৩১২ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর পর পুত্র শংকর দেব সিংহাসনে আরোহণ করে দিল্লিতে কর প্রেরণ বন্ধ করে দেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি মালিক কাফুরের নেতৃত্বে শংকর দেবের বিরুদ্ধে এক সমরাভিযান প্রেরণ করলে শংকর দেব যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। ফলে পুনরায় দেবগিরি রাজ্য দিল্লির শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। এভাবে ১৩১২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সমগ্র দক্ষিণ ভারতে সুলতান আলাউদ্দিন খলজির কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
দাক্ষিণাত্য বিজয়ের ফলাফল
সুলতান আলাউদ্দিন খলজির দাক্ষিণাত্য বিজয়ের ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূর প্রসারী। ১৩০৬ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৩১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দাক্ষিণাত্যে প্রেরিত প্রায় সব অভিযান সফলতার সাথে সমাপ্ত হয়। দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ কলহ ও বিবাদের সুযোগে সেনাপতি মালিক কাফুর দক্ষিণ ভারত জয় করতে সক্ষম হন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি উত্তর ভারতের বিজিত রাজ্যসমূহ নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বিদ্রোহপ্রবণ দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলোকে সরাসরি নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেননি। নিয়মিত কর দেওার শর্তে দক্ষিণ ভারতের স্থানীয় শাসকদেরই ক্ষমতায় বহাল রেখেছিলেন তবে এই অভিযান থেকে সেনাপতি মালিক কাফুর বিপুল উপঢৌকন সহকারে রাজধানী দিল্লিতে ফিরে আসেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি বীরত্বের সেনাপতি মালিক কাফুরকে ‘মালিক নায়েব উপাধিতে ভূষিত করেন। দাক্ষিণাত্য হতে আহরিত অগণিত ধন সম্পদ উত্তর ভারতে মুদ্রাস্ফীতির সূচনা করে, বাধ্য হয়ে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে মূল্যনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন ।
শাসন সংস্কার
সুলতান আলাউদ্দিন খলজি (১২৯৬-১৩১৬খ্রি:) ভারতের মধ্য যুগের ইতিহাসে শুধুমাত্র একজন শ্রেষ্ঠ বিজেতাই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ প্রশাসক। বিজিত অঞ্চলে তিনি যুগোপযোগী সুষ্ঠু প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের ন্যায় সুলতান আলাউদ্দিন খলজিও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রভাবশালী ও ক্রিয়াশীল উলেমা ও অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রভাব ক্ষুণ্ন করে একটি ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। পরবর্তীকালে সম্রাট আকবর ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনে সুলতান আলাউদ্দিন খলজিকে অনুসরণ করেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি বিজিত অঞ্চলে একটি কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে সাম্রাজ্যে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র প্রবর্তন করেন। তিনি নিজেকে ‘ইয়ামিন-উল-খিলাফত' ও ' নাসিরী আমির- উল-মুমেনিন' হিসেবে অভিহিত করেন। সিংহাসনে আরোহণের অব্যবহিত পরে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি জালাল উদ্দিন খলজির বিধবা পত্মী মালিকা-ই-জাহান, পুত্র রুকনউদ্দিন ইব্রাহিম, হাজী মওলা, ভ্রাতুষ্পুত্র আকত খান, নও মুসলিম উমর খান ও মঙ্গু খান এবং অভিজাত শ্রেণির ব্যাপক বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
উপদেষ্টা ও পরামর্শদাতাদের সাথে আলাপ-আলোচনার পর বিদ্রোহের চারটি কারণ উদ্ঘাটিত হয়। এগুলো হলো- (১) রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা এবং শাসনকার্য সম্পাদনে সুলতানের অমনোযোগিতা ও ঔদাসীন্য,
(২) মাদক দ্রব্যের অপরিমিত প্রচলন,
(৩) আমির, মালিক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের সুসম্পর্ক, পারস্পরিক সম্প্রীতি এবং অবাধ মেলামেশা ও
(৪) অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য।
বিদ্রোহের কারণ চিহ্নিত করার পর তার মূলোৎপাটন করতে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
প্রথমত, শাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনয়নের লক্ষ্যে প্রশাসনিক কার্যাবলীর দায়িত্ব আমির ও উমারাহদের উপর ন্যস্ত না করে সুলতান নিজেই এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দ্বিতীয়ত, সুলতান মাদক জাতীয় দ্রব্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং অবাধ সরবরাহ নিষিদ্ধ করেন। জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে সুলতান নিজেই মদ্যপান ত্যাগ করেন এবং সমস্ত পান-পাত্র ভেঙে ফেলেন।
তৃতীয়ত, সুলতানের বিনা অনুমতিতে আমির, মালিক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন, সামাজিক উৎসব, আমোদ-প্রমোদ, ভোজসভা এবং অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অভিজাত সম্প্রদায়ের কার্যকলাপের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখার উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যের সর্বত্র সুলতান অসংখ্য গুপ্তচর নিয়োগ করেন।
চতুর্থত, সুলতান আলাউদ্দিন খলজি বিশ্বাস করতেন যে, সম্পদের প্রাচুর্য থাকলেই জনসাধারণের মনে বিদ্রোহের মনোবৃত্তি উদ্রেক করে। তিনি আমির, মালিক, অভিজাত সম্প্রদায় ও বিত্তবান হিন্দুদের জায়গীর ও নিষ্কর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন এবং বখশিস, পেনশন, ভাতা প্রভৃতি সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দেন। ফলশ্রুতিতে হিন্দু-মুসলিম অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রভাব-প্রতিপত্তি হ্রাস পায়। শাসন ব্যবস্থায় এ ধরনের কঠোর নীতি সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের সময় প্রচলিত ছিল আলাউদ্দিন খলজি সেই নীতিরই পুন:প্রচলন করেন।
রাজস্ব সংস্কার
সুলতান আলাউদ্দিন খলজি সাম্রাজ্যের আর্থিক অবস্থার উন্নতি বিধান এবং প্রজাসাধারণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করেন। মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রধান আয়ের উৎস ছিল ভূমিকর (Land Revenue)। উৎপাদনের পরিমাণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন এবং রাজস্ব পুন: নির্ধারণের জন্য সর্বপ্রথম ভূমি জরিপের প্রবর্তন করেন সুলতান আলাউদ্দিন খলজি। রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার সাধন করে চৌধুরী, খুত, মুকাদ্দাম প্রভৃতি রাজস্ব কর্মচারীগণ ইতোপূর্বে খাজনাবিহীন যেসব ভূমি ভোগ দখল করে আসছিল তা বাতিল করা হয়। রায়তদের নিকট থেকে প্রত্যক্ষভাবে রাজস্ব আদায় করার জন্য নতুন নতুন রাজস্ব কর্মচারী নিয়োগ করে তাদেরকে নগদ বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধিকল্পে ভূমি রাজস্ব ছাড়াও গোচারণ ভূমি কর, গৃহকর এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্ক আরোপ করেন এবং জায়গীর প্রথা বিলুপ্ত করেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নিরাপত্তা কর হিসেবে বিবেচিত জিজিয়া আরোপ করেন। দোয়াব ও অন্যান্য উপদ্রুত অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত কর ধার্য করেন। শুধুমাত্র দোয়াব অঞ্চল ছাড়া সর্বত্র নগদ অর্থে রাজস্ব আদায় করা হতো। ঐতিহাসিক বারানীর মতে, এভাবে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি সমগ্র দেশকে একটিমাত্র কেন্দ্রিয় রাজস্ব প্রশাসনের আওতাভুক্ত করেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজি রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার সাধন এবং নতুন নতুন করারোপ এবং আদায়ের ফলে সাম্রাজ্যব্যাপী আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে আসে এবং জনসাধারণের জীবন-মানের সমৃদ্ধি ঘটে। বলা হয়ে থাকে যে, সুলতান আলাউদ্দিন খলজি কর্তৃক প্রবর্তিত ভূমি জরিপ পদ্ধতি পরবর্তীকালে শের শাহ এবং মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে নতুনরূপে বিকাশ লাভ করে ।
সামরিক সংস্কার
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দমন, সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করণ এবং রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি এক বিশাল সুদক্ষ সেনাবাহিনী গড়ে তুলেন। তিনি একটি স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন করে আরিজ-ই-মামালিক (সমরমন্ত্রী) এর নিকট তা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করেন। জায়গীরের পরিবর্তে সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করেন। দাক্ষিণাত্য বিজয়ের মাধ্যমে অজস্র ধন-সম্পদ উত্তর ভারতে নিয়ে আসার ফলে সাম্রাজ্যে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী যাতে সেনাবাহিনীর ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে এজন্য সুলতান মূল্যনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরাজমান দুর্নীতি দূর করার লক্ষ্যে সুলতান আলাউদ্দিন মুসলিম ভারতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম অশ্বচিহ্নিত করার প্রথা ‘দাগ’ এবং সেনাবাহিনীর বিস্তারিত বর্ণনা সম্বলিত তালিকা করার রীতি প্রবর্তন করেন, যা ‘হুলিয়া' নামে সর্বজন পরিচিত। তিনি ছিলেন খলজি সামরিক পদ্ধতির গোড়াপত্তনকারী। সুলতান আলাউদ্দিন খলজির শাসনামলে সেনা বাহিনীকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। যথা- অশ্বারোহী বাহিনী, পদাতিক বাহিনী এবং হস্তী বাহিনী। ঐতিহাসিক ফিরিস্তার বর্ণনা হতে জানা যায় যে, আলাউদ্দিন খলজির অশ্বারোহী বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪,৭৫,০০০। সুলতানের পদাতিক বাহিনীর সংখ্যা ছিল অশ্বারোহী বাহিনীর প্রায় দ্বিগুণ ।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions