তুঘলক বংশ
১৩১৬ খ্রিস্টাব্দের ২ জানুয়ারি সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মৃত্যুর পর ‘মালিক তাজ-উল-মালিক কাফুরী' উপাধি প্রাপ্ত এবং ‘হাজার দিনারী' খ্যাত প্রধানমন্ত্রী মালিক কাফুর সুলতানের পাঁচ বছর বয়স্ক শিশুপুত্র শিহাবউদ্দিন ওমরকে দিল্লির মসনদে বসান এবং নিজে তাঁর অভিভাবক নিযুক্ত হন। তিনি সুলতানের অপর দুই পুত্র খিজির খান ও সাদী খানের চক্ষু উৎপাটন করে তাদেরকে কারারুদ্ধ করেন এবং আলাউদ্দিনের বিধবা স্ত্রীকে জোরপূর্বক বিবাহ করেন। কিন্তু মালিক কাফুরের স্বৈরাচারী শাসন সকল সীমা অতিক্রম করলে অভিজাত শ্রেণির বিশেষ সহায়তায় সুলতানের দেহরক্ষীরা ৩৬ দিন পর তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর সুলতান আলাউদ্দিন খলজির তৃতীয় পুত্র মুবারক ‘কুতুবউদ্দিন মুবারক শাহ' উপাধি ধারণ করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন।
কিন্তু মুবারক শাহ ছিলেন অলস, অকর্মণ্য ও ভোগবিলাসী। তিনি বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দিয়ে রাজ্যের সমস্ত শাসনভার দাক্ষিণাত্যের শাসন কর্তা খসরু খানের উপর ন্যস্ত করেন। এমনকি তিনি পিতা আলাউদ্দিন খলজির শাসন ব্যবস্থার কঠোর নীতি শিথিল করেন। তিনি অনেক আইন কানুন বাতিল করে উদারতার পরিচয় প্রদানে সচেষ্ট হন। তিনি 'খলিফা' উপাধিও ধারণ করেন। এমতাবস্থায় সাম্রাজ্যের সর্বত্র অরাজক পরিস্থিতির সুযোগে খসরু খান মুবারক শাহকে হত্যা করে দিল্লির মসনদে আরোহণ করেন। তিনি নাসিরউদ্দিন খসরু শাহ উপাধি ধারণ করেন। সমসাময়িককালের মুসলিম ঐতিহাসিকগণ খসরু শাহের শাসনকালকে সন্ত্রাসের রাজত্ব বলে চিহ্নিত করেছেন।
খসরু খানের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে দিল্লির অভিজাত আমির উমারাহগণ পাঞ্জাবের অন্তর্গত দীপালপুরের শাসক গাজী মালিককে দিল্লির মসনদ দখলের জন্য আহ্বান করেন। ১৩২০ খ্রিস্টাব্দে গাজি মালিক দিল্লির উপকণ্ঠে সংঘটিত এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে খসরু খানকে পরাজিত ও নিহত করেন। গাজী মালিক গিয়াসউদ্দিন তুঘলক উপাধি ধারণ করে ১৩২০ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে উপবেশন করেন। তিনি ছিলেন তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তুঘলক বংশকে ‘কারাউনা তুর্কি বংশ নামেও অভিহিত করা হয়। গিয়াসউদ্দিন তুঘলক, মুহম্মদ বিন তুঘলক এবং ফিরোজশাহ তুঘলক ছিলেন এই বংশের তিনজন শ্রেষ্ঠ সুলতান। ১৩২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪১৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই বংশের সর্বমোট ৯জন শাসক প্রায় ৯৩ বছর যাবৎ ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেন।
সুলতান গিয়াস উদ্দিন তুঘলক (১৩২০-১৩২৫খ্রি.)
গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের বাল্য নাম ছিল গাজী তুঘলক। তিনি ছিলেন কারাউনা তুর্কি গোষ্ঠীর অন্তর্গত। গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের পরিবার সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের শাসনামলে দিল্লিতে আসেন। তার পিতা বলবনের অধীনে একজন তুর্কি দাস হিসেবে নিযুক্ত হন এবং পাঞ্জাবের এক জাঠ রমণীকে বিবাহ করেন। গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের ধমনীতে তাই তুর্কি ও রাজপুত রক্তের যৌথ উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহণকারী গিয়াসউদ্দিন তুঘলক একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও স্বীয় মেধা, প্রতিভা, দৃঢ় মনোবল এবং প্রবল আত্মবিশ্বাসের গুণে সুলতান আলাউদ্দিন খলজির অধীনে ‘সেনাবাহিনীর প্রধান রক্ষক' পদে নিযুক্ত হন। ১৩০৫ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন খলজি তাঁকে পাঞ্জাবের অন্তর্গত দীপালপুরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। এসময় উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে প্রায় ২৯ বার মোঙ্গল আক্রমণ মোকাবিলা করে তিনি সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মন:তুষ্টি অর্জন করেন। এতে খুশি হয়ে সুলতান গিয়াসউদ্দিনকে ‘মালিক উল গাজি’ বা ‘গাজি মালিক' উপাধি প্রদান করে। ১৩২০ খ্রিস্টাব্দের ৮ সেপ্টেম্বর নাসিরউদ্দিন খসরু শাহকে পরাজিত ও নিহত করেন। গাজী মালিক সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক উপাধি ধারণ করে ভারতীয় উপমহাদেশে তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে দিল্লির ছয় মাইল অদূরে আফগানপুর নামক স্থানে তোরণ ধ্বংসের কারণে সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক মৃত্যুবরণ করেন ।
মুহম্মদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১ খ্রি.)ঃ
মুহম্মদ বিন তুঘলকের ঘটনাবহুল রাজত্বকাল
তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের জ্যেষ্ঠপুত্র ফখরুদ্দিন মুহম্মদ জুনা খান বাল্যকালে সামরিক ও বেসামরিক উভয় শিক্ষায় শিক্ষিত হন। একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। খলজি বংশের শাসনামলে সুলতান নাসির উদ্দিন খসরু শাহ জুনা খানকে ‘আমির-ই-আখুর' তথা রাজকীয় অশ্বশালার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন। তুঘলক বংশ প্রতিষ্ঠায় জুনা খান পিতা গিয়াসউদ্দিন তুঘলককে সহায়তা করেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক পুত্র জুনা খানকে ‘উলুঘ খান' উপাধি প্রদান করে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে জুনা খান মুহম্মদ বিন তুঘলক উপাধি ধারণ করে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬ বছর মুহম্মদ বিন তুঘলক দিল্লির সুলতান হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
মুহম্মদ বিন তুঘলক কর্তৃক গৃহীত পাঁচটি পরিকল্পনা হলো-
১. দেবগিরিতে রাজধানী স্থানান্তর (১৩২৬-১৩২৭খ্রি.);
২. খোরাসান অভিযান (১৩২৭-১৩২৮ খ্রি.);
৩. প্রতীক তাম্র মুদ্রা প্রচলন (১৩২৯-১৩৩০ খ্রি.);
৪. কারাচিল অভিযান (১৩৩২-১৩৩৩ খ্রি.) এবং
৫. দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি (১৩৩৪ খ্রি.)।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions