ফিরোজ শাহ তুঘলক
ফিরোজ শাহ তুঘলক ছিলেন সুলতান গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের ভ্রাতুষ্পুত্র। তাঁর পিতার নাম ছিল রজব। তিনি ১৩০৯ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাঞ্জাবের অন্তর্গত আবোহরের ভাট্টি রাজপুত রায়মলের কন্যা লায়লা (কাদবানু) এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ফিরোজের ধমনীতে ছিল তুর্কি ও রাজপুত রক্তের সংমিশ্রণ। মাত্র ৭ বছর বয়সে পিতৃ বিয়োগের ফলে ফিরোজ পিতৃব্য গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের নিকট লালিত পালিত হন। সুলতান তাঁকে ধর্মীয়, যুদ্ধবিদ্যা, শাসন সংক্রান্ত ও অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলক সিন্ধুর তাঘির বিদ্রোহ দমনরত অবস্থায় ১৩৫১ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ থাট্টায় অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ করেন। সুলতানের মৃত্যুর পর রাজকীয় বাহিনীর মধ্যে চরম অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং উপস্থিত আমির ও অভিজাতবর্গের অনুরোধের প্রেক্ষিতে ফিরোজ ‘ফিরোজ শাহ তুঘলক' উপাধি ধারণ পূর্বক সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুলতান হওয়ার অব্যবহিত পরই ফিরোজ শাহ তুঘলক রাজকীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা আনয়ন করেন। গোলযোগ পূর্ব মুহুর্তে মুহম্মদ বিন তুঘলকের সময় খাজা জাহান নামে একজন নায়েব, এক শিশুকে সুলতানের পুত্র বলে ঘোষণা করে দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে নিজে তাঁর অভিভাবক নিযুক্ত হন। কিন্তু আমির উমারাহগণের ক্রমাগত বিরোধিতার কারণে খাজা জাহান সুলতানের নিকট অবশেষে আত্মসমর্পণ করেন। তখন সুলতান তাকে সামানার শাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন। দুর্ভাগ্যবশত খাজা জাহান সামানা ও সুনাম অঞ্চলের সেনাধ্যক্ষ শের খানের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।
বাংলায় অভিযান
১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে মুহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে হাজী ইলিয়াস ‘শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ' উপাধি ধারণ করে বাংলায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ইলিয়াস শাহ সমগ্র বাংলা, ত্রিহুত, নেপালের কিয়দংশ এবং উড়িষ্যা বিজয় করে বেনারস পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্যের সীমানা বর্ধিত করেন। সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ৭০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে স্বয়ং বাংলা অভিযান করেন। ইলিয়াস শাহের রাজধানী ছিল পান্ডুয়া। দিল্লির সুলতানের আগমনের কারণে রাজধানী পাণ্ডুয়া হতে ১০/১২ মাইল দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত একডালা দুর্গে ইলিয়াস শাহ আশ্রয় গ্রহণ করেন। সুলতান ফিরোজ শাহ এ ডালা দুর্গ অবরোধ করেন। কিন্তু কয়েক মাস একডালা দুর্গ অবরুদ্ধ থাকার পর বর্ষার আগমনে প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হলে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক বাধ্য হয়ে সসৈন্যে রাজধানী দিল্লিতে প্রত্যাবর্তন করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। রাজদরবারের অভ্যন্তরীণ কলহের সুযোগ নিয়ে বাংলার আমির জাফর খানের অনুরোধে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দে ৭০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে পুনরায় বাংলা আক্রমণ করেন। সিকান্দার শাহ পিতৃ কৌশল অবলম্বন করে সসৈন্যে একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। বাধ্য হয়ে দীর্ঘকাল অবরোধের পর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক সিকান্দার শাহের সাথে সন্ধি স্থাপন করে দিল্লিতে প্রত্যাবর্তন করেন ।
জনহিতকর কার্যাবলী
ফিরোজ শাহ তুঘলক একজন রণকুশলী যোদ্ধা এবং সুদক্ষ সেনাপতি না হলেও তিনি একজন প্রজারঞ্জক শাসক ছিলেন। মুহম্মদ বিন তুঘলকের পঞ্চ পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার ফলে জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ সঞ্চারিত হয় সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের প্রচেষ্টার ফলে তা অনেকটাই প্রশমিত হয়। শামস-ই-সিরাজ আফিফের মতে সুলতান প্রায় ২৩ প্রকার অবৈধ কর রহিত করেন। ইসলাম ধর্মের প্রতি অগাধ বিশ্বাস থাকার কারণে সুলতান কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে চার ধরণের কর ধার্য করেন। এগুলো হলো- (১) খারাজ (২) যাকাত, (৩) জিজিয়া ও (৪) খুমস। ঐতিহাসিক বারানী ফিরোজ শাহ তুঘলককে ভারতের প্রথম সত্যিকারের মুসলিম রাজা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের সম্প্রসারণের জন্য সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক আন্ত:প্রাদেশিক শুল্ক উঠিয়ে দেন। জনসাধারণের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে দ্রব্য মূল্যের সহনীয় মাত্রার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়। কৃষি ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে সুলতান ৪টি খাল এবং ১৫০টি কূপ খনন করেন। ফলশ্রুতিতে অনেক অনাবাদি ও পতিত জমি চাষের আওতায় আসে। এছাড়াও তিনি কৃষকদের কৃষি ঋণ প্রদান করে কৃষির উন্নতিতে সহযোগিতা প্রদান করেন। ফিরোজ শাহ তুঘলক ধাতু ও রূপার সংমিশ্রণে ‘আধা’ (অর্ধ জিতল) এবং ‘বিক’ (জিতলের এক চতুর্থাংশ) নামক দু'ধরণের মুদ্রার প্রবর্তন করেন। সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক বিচার ব্যবস্থায় মানবোচিত সংস্কার সাধন করেন। বিচার ব্যবস্থায় শারীরিক অঙ্গচ্ছেদসহ প্রভৃতি নিষ্ঠুর শাস্তি প্রথা রহিত করেন। সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ছিলেন একজন উদার ও জনকল্যাণকর শাসক। জনগণের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সুলতান বেশ কয়েকটি মানব কল্যাণকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যা ইতিহাসে ‘মাতামহী সুলভ ব্যবস্থাপনা' (Grand Motherly Legislation) নামে পরিচিত। এই বিভাগ থেকে এতিম ও অসহায় মুসলিম মেয়েদের বিবাহের জন্য অর্থ সাহায্য প্রদান করা হতো। সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক রাজ্যের বেকার সমস্যা সমাধানকল্পে ‘কর্মসংস্থান সংস্থা' নামে একটি বিশেষ সংস্থা গঠন করেন। দিল্লির কোতোয়ালের মাধ্যমে বেকার যুবকদের খুঁজে বের করে তাদেরকে যোগ্যতানুযায়ী চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। দরিদ্র, এতিম, অসহায় বৃদ্ধদের আর্থিক সাহায্য প্রদানের লক্ষ্যে সুলতান ‘দিওয়ান-ই-খয়রাত' নামক সরকারি সাহায্য দপ্তর স্থাপন করেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা প্রদানের জন্য সুলতান ইতিহাস প্রসিদ্ধ একটি চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন যা দারুল শেফা বিমারিস্তান নামে সর্বজন পরিচিত। এই দাতব্য প্রতিষ্ঠান থেকে বিনামূল্যে রোগীদের মধ্যে চিকিৎসা সেবা এবং ঔষধ সরবরাহ করা হত। সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক নির্মাতা হিসেবেও ইতিহাসে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। বাংলা অভিযানের সময় তিনি এলাকার নামকরণ করেন আজাদপুর এবং পাণ্ডুয়ার নামকরণ করেন ফিরোজাবাদ। এছাড়াও তিনি বেশ কয়েকটি নতুন শহর স্থাপন করেন যেগুলোর মধ্যে ফতেহাবাদ, হিসার, জৌনপুর, ফিরোজপুর প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।
এছাড়াও সুলতান ৪টি মসজিদ, ৩০টি প্রাসাদ, ২০০টি সরাইখানা, ৫টি খাল, ৪টি হাসপাতাল, ১০০টি কবর, ১০টি স্নানাগার, ১৫৩টি কূপ, ১০টি স্মৃতিস্তম্ভ এবং ১০০টি সেতু নির্মাণ করেন। সামন্ততান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক সেনাবাহিনীর সংস্কার সাধন করেন। নিয়মিত সৈন্যদেরকে নগদ বেতনের পরিবর্তে জায়গীর প্রদান করা হতো এবং অনিয়মিত সৈন্যদেরকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নগদ বেতন দেওয়া হত। সুলতানের অশ্বারোহী বাহিনীর সংখ্যা ছিল আশি থেকে নব্বই হাজার। ক্রীতদাসের রক্ষণাবেক্ষণ ও ভরণ-পোষণের জন্য সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ‘দিওয়ান-ই-বন্দেগান’ নামক একটি ক্রীতদাস বিভাগ সৃষ্টি করেন। তাঁর সময়ে ক্রীতদাসের সংখ্যা ছিল প্রায় ১,৮০,০০০ জন। সুলতান ক্রীতদাসদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা প্রদান করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রদান করেন। সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক জ্ঞানী-গুণী ও পন্ডিত ব্যক্তিদের উদার পৃষ্ঠপোষকতা ছিলেন। সুলতানের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ফুতুহাত-ই- ফিরোজ শাহী' রচনায় লেখকের প্রতি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৩৮৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ সেপ্টেম্বর ৮০ বছর বয়সে ফিরোজ শাহ তুঘলক মৃত্যুবরণ করেন।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions