Home » » সুলতান ইলতুৎমিশ

সুলতান ইলতুৎমিশ

সুলতান ইলতুৎমিশ

সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ ছিলেন ইলবারী তুর্কি গোষ্ঠির লোক। তিনি যেমন ছিলেন বুদ্ধিমান, তেমনি ছিলেন দৈহিক সৌন্দর্যের অধিকারী। এজন্য তাঁর ভাইয়েরা তাঁর প্রতি ছিল ঈর্ষাপরায়ণ। তারা ষড়যন্ত্র করে তাঁকে একজন দাস-ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেয়। 

দাস ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বোখারার প্রধান কাজী তাঁকে কিনে নেন। কাজী ইলতুৎমিশের লেখা-পড়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু কাজীর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীগণ ইলতুৎমিশকে বিক্রি করে দেয়। ইলতুৎমিশের নতুন মনিব হলেন জালালউদ্দীন নামক এক ব্যক্তি। এই জালালের কাছ থেকে কুতুবউদ্দিন আইবেক ইলতুৎমিশকে উচ্চমূল্যে কিনে নেন। 

ইলতুৎমিশের গুণে কুতুবউদ্দিন অত্যন্ত মুগ্ধ হন। তিনি তাঁকে মুক্ত করে বদায়ুনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন এবং নিজ কন্যার সাথে তাঁর বিয়ে দেন। কুতুবউদ্দিনের মৃত্যুর পর আরাম শাহ দিল্লির সুলতান হন। কুতুবউদ্দিনের সাথে আরাম শাহের সম্পর্ক নিয়ে মতভেদ আছে। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেন, আরাম শাহ ছিলেন কুতুবউদ্দিনের পুত্র। কিন্তু মিনহাজ-উস-সিরাজ বলেন, কুতুবউদ্দিনের কোন পুত্র সন্তান ছিলনা। তাঁর শুধু তিন জন কন্যা ছিলেন বলে মিনহাজ উল্লেখ করেছেন । আবুল ফজলের মতে, আরাম শাহ ছিলেন কুতুবউদ্দিনের ভাই।


সিংহাসনারোহণ 

আরাম শাহ শাসক হিসেবে একেবারেই অযোগ্য প্রমাণিত হন। দিল্লির আমিরগণ তাই কুতুবউদ্দিনের জামাতা ও বদায়ুনের শাসনকর্তা ইলতুৎমিশকে সুলতান পদ গ্রহণ করার জন্য আহ্বান করেন। ইলতুৎমিশ এতে রাজী হন। দিল্লির অদূরে আরাম শাহের সাথে তাঁর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে জয়ী হয়ে ১২১১ খ্রিস্টাব্দে ইলতুৎমিশ দিল্লির সিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজকীয় উপাধি হয় সুলতান শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশ। 

তিনি সিংহাসনে বসার পর গজনীর শাসনকর্তা তাজউদ্দিন ইয়ালদুজ ও সিন্ধুর শাসনকর্তা নাসিরউদ্দিন কুবাচা তাঁর কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন। বাংলার শাসনকর্তা আলী মর্দান খলজীও স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আমিরদের মধ্যেও রেষারেষী ছিল। তাঁরা ছিলেন তিনভাগে বিভক্ত। মুহম্মদ ঘোরির আমলের আমিরগণ “মুইজ্জী আমির”, কুতুবউদ্দিনের আমলের আমিরগণ “কুতুবী আমির” এবং ইলতুৎমিশের আমলের আমিরগণ “শামসী আমির” নামে অভিহিত হতেন। কুতুবী আমিরগণ ইলতুৎমিশকে সমকক্ষ এবং মুইজ্জী আমিরগণ তাঁকে তাঁদের চেয়ে কম যোগ্যতা সম্পন্ন বলে গণ্য করতেন। ইলতুৎমিশ বিদ্রোহী আমিরদের জুধের যুদ্ধে পরাজিত করে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেন এবং নিজের অবস্থান মজবুত করেন। 

১২১৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইয়ালদুজকে তরাইনের যুদ্ধে পরাজিত করেন। তিনি কুবাচাকেও পরাজিত করেন। ঠিক এই সময় আর একটা ভয়াবহ বিপদ উপস্থিত হয়। মধ্য এশিয়া দিক থেকে দিগ্বিজয়ী বীর চেঙ্গিস খান সমগ্র মধ্য এশিয়া এ সময় পদানত করেন। খাওয়ারিজমের শাহ তাঁর নিকট পরাজিত হন। শাহের পুত্র জালাল উদ্দিন ইলতুৎমিশের কাছে আশ্রয় চান। ইলতুৎমিশ তখন পড়েন উভয় সঙ্কটে। আশ্রয় প্রার্থীকে আশ্রয় না দিলে রীতি রক্ষা হয় না। অপরদিকে আশ্রয় দিলে চেঙ্গিসের কোপানলে পড়তে হবে। শেষ পর্যন্ত তিনি বুদ্ধিমত্তার আশ্রয় নিলেন। তিনি জালালকে বলে পাঠালেন যে ভারতের আবহাওয়া তাঁর জন্য তেমন সুখকর হবে না, সুতরাং তিনি যেন অন্যত্র আশ্রয় খুঁজে নেন। বাধ্য হয়ে জালালকে ভারত ত্যাগ করতে হয়। তবে যাওয়ার আগে তিনি লাহোর, মুলতান ইত্যাদি অঞ্চল লুট করে যান। এতে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্থ হন ইলতুৎমিশের শত্রু কুবাচা। 

জালালের পর পরই চেঙ্গিস ভারতের সিন্ধুতে এসে উপনীত হন। ইলতুৎমিশ তাঁকে অনেক উপঢৌকন দিয়ে বিদায় করেন। এভাবে ইলতুৎমিশের চতুর বুদ্ধিমত্তায় সমূহ বিপদ থেকে ভারত রক্ষা পেল। ইলতুৎমিশ অত:পর বাংলার দিকে নজর দেন। বাংলায় তখন গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজীর শাসন চলছিল। আলী মর্দানকে পরাজিত ও নিহত করে হুসামউদ্দিন ইওয়াজ খলজী ১২১১ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করেন। তিনি “সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী” উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি সুশাসক ছিলেন। তাঁর নামে মুদ্রা প্রচলিত ছিল এবং ‘খুতবায়’ তাঁর নাম উচ্চারিত হতো। এ সবই রাজকীয় ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। 

১২২৫ খ্রিস্টাব্দে ইলতুৎমিশ নিজেই ইওয়াজের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। ইওয়াজ বশ্যতা স্বীকার করে রেহাই পান। ইলতুৎমিশ তাঁকে স্বপদে বহাল রাখেন। কিন্তু সুলতান রাজধানীতে ফিরে আসা মাত্র ইওয়াজ খলজী দিল্লির কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন। তাঁকে দমন করার জন্য ইলতুৎমিশ তাঁর বড় ছেলে নাসিরউদ্দিন মাহমুদকে প্রেরণ করেন। ইওয়াজ যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন (১২২৭ খ্রি.)। বাংলার উপর দিল্লির কর্তৃত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতোমধ্যে সাম্রাজ্যের পশ্চিম এলাকাও ইলতুৎমিশের নিয়ন্ত্রণে আসে। ইয়ালদুজের মৃত্যুর পর লাহোরের উপর তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বাকী ছিল সিন্ধু ও মুলতান। 

১২২৮ খ্রিস্টাব্দে ইলতুৎমিশ নাসিরউদ্দিন কুবাচাকে বাক্কারের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। সিন্ধু নদ পার হতে গিয়ে কুবাচা মারা যান। ফলে সিন্ধু ও মুলতানের উপরও তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১২২৯ খ্রিস্টাব্দে ইলতুৎমিশ বাগ্দাদের আব্বাসীয় খলিফা আল- মুনতাসিরের কাছ থেকে “সুলতান-উল-আজম” খেতাব সহ রাজছত্র ও রাজকীয় পোশাক উপঢৌকন হিসেবে লাভ করেন। এতে তাঁর গৌরব অনেক বেড়ে যায়। 

নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীদের একে একে দমন করার পর ইলতুৎমিশ হিন্দু রাজাদের বিদ্রোহ দমনে মনোযোগ দেন। তিনি রণথম্ভোর পুনর্দখল করেন। গোয়ালিয়রও তাঁর দখলে আসে। মালবের ভিলসা এবং উজ্জয়িনীও তিনি জয় করেন। 

ইলতুৎমিশ অত্যন্ত দক্ষ শাসক ছিলেন। যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্যেও তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি জ্ঞানী-গুণীর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতে প্রাথমিক তুর্কি সালতানাতের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। পঁচিশ বছর অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে শাসন করার পর ১২৩৬ খ্রি. তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ।

0মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Comment below if you have any questions

Contact form

নাম

ইমেল*

বার্তা*

-->