হাদিস কাকে বলে
‘হাদিস' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে- কথা ও বাণী। ইসলামি পরিভাষায় নবী হিসেবে রাসূলুল্লাহ (স) জীবনে যা বলেছেন, যা করেছেন, যা অনুমোদন দিয়েছেন এবং সাহাবিদের যে সমস্ত কাজ ও কথার প্রতি সমর্থন ও সম্মতি দান করেছেন তার সবগুলোই হাদিস। অনুরূপভাবে সাহাবী ও তাবেঈদের কথা, কাজ এবং সমর্থনও হাদিস হিসেবে পরিগণিত।
হাদিসের বিষয়ে আল্লামা কিরমানী (র) লিখেছেন, “কুরআনের পর সকল জ্ঞানের মধ্যে সর্বাধিক উন্নত ও তথ্য সমৃদ্ধ শ্রেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে হাদিস।” হাদিসকে সুন্নাহও বলা হয়। তবে সুন্নাহ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে রীতিনীতি, প্রথা ও নিয়ম রাসূলে করীম (স)-এর হাদিসও এক প্রকার ওহী। কেননা মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরগণ বলেছেন, ওহী দু'প্রকার-
(১) প্রকাশ্য ও পঠিত ওহী
(২) অপ্রকাশ্য ও অপঠিত ওহী।
কুরআন হল প্রকাশ্য ও পঠিত আল্লাহর বাণী এবং হাদিস হল গোপন ও অপঠিত ইলাহী নির্দেশ। রাসূলুল্লাহ (স) কখনও শরীআত ও ইসলাম বিষয়ক কোন কথা নিজের পক্ষ থেকে বানিয়ে বা মনগড়া বলেননি। আল্লাহর হুকুম ছাড়া যে তিনি কোন কথা বলেননি আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং তার সাক্ষ্য দিচ্ছেন-
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ الا وحي يوحى
“এবং সে মনগড়া কথা বলে না। এতো ওহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।” (সূরা আন-নাজম-৫৩ : ৩-৪)
আর প্রকাশ্য ওহী ছাড়া অন্য যে সমস্ত কথা তিনি সরাসরি আল্লাহর নিকট থেকে পেয়েছেন সেগুলোকে হাদিসে কুদসি বলা হয় ।
পরিভাষায় মহানবী (স)-এর কথা, কাজ সমর্থনকেই হাদিস বলা হয়। আর সাহাবীগণের কথা, কাজ ও সমর্থনকে বলা হয় আছার এবং তাবিঈন ও তাবি-তাবিঈনের কথা, কাজ ও সমর্থনের বিবরণকে বলা হয় ফাতাওয়া ।
হাদিসের আলোচ্য বিষয়
হাদিসের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, রাসূলুল্লাহর (স) জীবন ও কর্ম, তাঁর কথা, কাজ এবং সম্মতিমূলক কথা-কাজ-আচরণ, তাঁর সামগ্রিক জীবন ও জীবনাদর্শ-ই হচ্ছে হাদিসের আলোচ্য বিষয়। হাদিস-বিজ্ঞানীগণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে বলেন, “ইলমে হাদিসের বিষয়বস্তু বা আলোচ্য বিষয় হল- রাসূলে করীম (স)-এর মহান সত্তা এ হিসেবে যে, তিনি আল্লাহর রাসূল ।”
অনুরূপভাবে সাহাবায়ে কিরামের কথা-কাজ ও অনুমোদনমূলক কথা এবং কাজের বিবরণও হাদিসের আলোচ্য বিষয়। তেমনিভাবে তাবিঈনের কথা, কাজ ও তাঁদের অনুমোদনমূলক কথা ও কাজের বিবরণও আলোচ্য বিষয়। শরীআতের দ্বিতীয় উৎস হিসেবে কুরআন মাজীদের পরেই হাদিসের স্থান। আর এ হাদিস কুরআনেরই ব্যাখ্যা ও বাস্তব-রূপায়ণ ।
হাদিসের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক জীবন যাপনে করার জন্য হাদিসের জ্ঞান অপরিহার্য। কেননা রাসূলের আনুগত্যের উদ্দেশে তাঁর বক্তব্য, কর্ম, অবস্থা ও অনুমোদিত বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন আবশ্যক। ইসলামি শরীআতের বিধি-বিধান ও হুকুম- আহকাম সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞানার্জন রাসূলের হাদিসের মাধ্যমেই সম্ভব। আর হাদিসের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তা বিশ্বাস ও সে অনুযায়ী আমল এবং জীবনে বাস্তবায়ন মানব জীবনের মুক্তির জন্য অপরিহার্য।
হাদিসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
কুরআন মাজীদের পরেই হাদিসের স্থান এবং এ হিসেবে হাদিস ইসলামি শরীআতের দ্বিতীয় উৎস। হাদিস হচ্ছে রাসূল (স)-এর জীবনালেখ্য ও কুরআনের ব্যাখ্যা। তাই ইসলামি শরীআতে হাদিসের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআনে যে সমস্ত হুকুম-আহকাম সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ হাদিসে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ সালাত ও যাকাতের কথা বলা যেতে পারে। কুরআনে শুধু বলা হয়েছে— “সালাত কায়েম কর এবং যাকাত দাও।” কিন্তু কীভাবে সালাত কায়েম করতে হবে এবং কীভাবে যাকাত দিতে হবে তার বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে নেই। তাঁর হাদিসে এর ব্যাখ্যা ফুটে ওঠেছে। হাদিস ও সুন্নাহর মাধ্যমেই আমরা এ সমস্ত বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ জানতে পারি। সুতরাং উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য হাদিস শিক্ষা করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
দৈনন্দিন জীবনে হাদিসের গুরুত্ব
মহান আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসূল সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত হওয়া এবং ইসলাম সম্পর্কিত যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভ করার জন্যই হাদিস অপরিহার্য। উম্মতে মুহাম্মদীর দৈনন্দিন চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক- পরিচ্ছদ ইত্যাদি সকল কাজেই হাদিসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সর্ববিষয়ে হাদিসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, তালাক, ব্যবসায়- বাণিজ্য, বিচার-আচার, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সন্ধি-চুক্তি, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্রিয়াকর্মের প্রত্যেকটি বিষয় সম্পাদনের জন্য হাদিসের প্রয়োজন। হাদিসকে অস্বীকার করার অর্থ হল ইসলামকেই অস্বীকার করা। কেননা আল্লাহ ঘোষণা করেন- “হে মানবজাতি! রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” (সূরা হাশর-৫৯ : ৭)
তাই হাদিসের বিধানগত গুরুত্ব হচ্ছে- তা শরীআতের বিধান নির্ধারণ ও নীতিমালা প্রণয়ন করে।
অনুসরণীয় আদর্শ
ইসলামি শরীআতের নিরিখে মহানবীর (স) আদেশ-নিষেধ, তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ড, কথা-বার্তা-তথা গোটা জীবনই উম্মাহর জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
بل
لَقَد كَانَ لَكُم فِي رَسُولِ اللهِ أسْوَةٌ حَسَنَةٌ
“আল্লাহ রাসূলের জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আহযাব ৩৩ : ২১)
রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্যও তাই। মহান আল্লাহ বলেন-“রাসূলকে অনুসরণের জন্যই প্রেরণ করেছি।” (সূরা নিসা ৪ : ৬৪)
أَطِيعُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ قُلْ
“বলুন, অনুসরণ কর আল্লাহ ও রাসূলের।” (আলে ইমরান ৩ : 32)
সুতরাং রাসূলের আনুগত্যের জন্য তাঁর সামগ্রিক জীবন তথা হাদিসের প্রামাণ্য দলিল অনুসরণ করা ঈমানদার হওয়ার জন্য অপরিহার্য।
কুরআন বুঝার জন্য হাদিসের গুরুত্ব
হাদিসের ব্যাখ্যা ব্যতীত মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সকল বিধি-বিধান সঠিক ও যথাযথভাবে বুঝা সম্ভব নয়। সুতরাং কুরআনের মর্ম সঠিকভাবে বুঝতে হলে নবী (স) যে ব্যাখ্যা করেছেন তা অবশ্যই জানতে হবে। কারণ রাসূলে করীম (স)- এর সমস্ত জীবনই কুরআনের ব্যাখ্যা। একবার হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা)-এর নিকট কিছু লোক এসে রাসূলুল্লাহ (স)- এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কী কুরআন পড় না? তাঁরা বললেন, হাঁ। তখন তিনি বললেন, কুরআনই তাঁর চরিত্র।”
অতএব হাদিস ছাড়া রাসূল (স) কে জানা, বুঝা ও অনুসরণের কোন উপায় নেই। সুতরাং রাসূলের অনুকরণ ও অনুসরণের জন্যও হাদিসের একান্ত প্রয়োজন ।
ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে হাদিসের গুরুত্ব
হাদিস ইসলামের ইতিহাসের প্রামাণ্য উৎস। হাদিস পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ দ্বারা ইতিহাস চর্চার পথ উন্মোচিত হয়েছে। হাদিস বর্ণনাকারী অগণিত ব্যক্তির জীবন, কর্মতৎপরতা ও চরিত্র উদঘাটন করতে গিয়ে বিপুলায়তন নতুন তথ্যের ভিত্তিতে ইসলামের ইতিহাস গড়ে ওঠেছে। হাদিসের মাধ্যমে সমকালীন আরবসহ সমগ্র বিশ্ব পরিস্থিতি ও জীবন যাত্রার তথ্য মিলে। এ ছাড়াও পৃথিবীর আদি ইতিহাসের অনেক নির্ভুল-সঠিক তথ্যও এর মাধ্যমে পাওয়া যায়।
হাদিস জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎস
হাদিস কেবল মহানবীর (স) জীবন ও উপদেশের সংকলনই নয়; বরং এটা তাঁর সকল কর্মতৎপরতার পূর্ণাঙ্গ দলিল। ধর্ম, যুদ্ধ, শান্তি, বৈদেশিক নীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, যুদ্ধের নিয়ম-কানুন, রীতি-নীতি সবই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। জ্ঞান- বিজ্ঞানের উৎস হিসেবে হাদিসের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা তুলে ধরে শাহ ওয়ালী উল্লাহ (র) লিখেন—
“ইলমে হাদিস সকল প্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের তুলনায় অধিক উন্নত, উত্তম এবং দ্বীন ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের ভিত্তি । হাদিস সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও তাঁর সাহাবিদের কথা, কাজ ও সমর্থন বিধৃত। বস্তুত হাদিস অন্ধকারে আলোক স্তম্ভ, যেন সর্বদিক উজ্জ্বলকারী পূর্ণ শশী। যে এর অনুসারী হবে, একে আয়ত্ত করবে, সে সুপথ প্রাপ্ত হবে; সে লাভ করবে বিপুলায়তন কল্যাণের ফলগুধারা।” (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা)
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions