কম্পিউটারের বিবর্তন
প্রাথমিক যুগ
কম্পিউটার উদ্ভাবন ও বিসত্মারের পিছনে রয়েছে শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি ও গবেষণার ফলাফল। বলা যায় গণনার প্রচেষ্টা কম্পিউটার উদ্ভাবনের প্রাচীনতম ঘটনা। প্রাচীনকালে মানুষ গণনার জন্য নুড়ি, ঝিনুক, দড়ির গিট ইত্যাদি ব্যবহার করতো। খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চদশ অব্দে প্রথম গণনাযন্ত্র অ্যাবাকাস প্রচলন হয়। এরপর সময় পবিবর্তনের সাথে সাথে গণনাযন্ত্রেরও অনেক পরিবর্তন সাধিত হয় এবং ১৬৪২ খ্রীষ্টাব্দে বেস্নইজ প্যাসকেল আবিষ্কৃত গিয়ার চালিত গণনাযন্ত্র এক নতুন যুগের সূচনা করে। পরবর্তীতে ১৬৭১ সালে জার্মান গণিতবিদ গটফ্রাইড উইলহেম লিবনিজ (Gottfried Wilhelm Leibnitz) চাকা ও দন্ড ব্যবহার করে গুণ ও ভাগের ক্ষমতা সম্পন্ন যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর তৈরি করেন। সেই সময় কৌশল তত উন্নত ছিল না এবং ক্যালকুলেটরের উপযুক্ত সুক্ষ্ণ যন্ত্রাংশ তৈরি অসম্ভব ছিল বিধায় এই যন্ত্র নির্ভরযোগ্য মনে হতোনা। পরবর্তীতে যান্ত্রির কৌশলের উন্নতির ফলে ক্যালকুলেটরের গুণগত মান উন্নত হয় এবং এই যন্ত্র নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠে।
১৭৮৬ সালে জার্মানির মুলার ‘‘ডিফারেন্স ইঞ্জিন’’ নামে পরিচিত একটি কালকুলেটর বা গণনাযন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করেন। এর প্রায় দুই যুগ পর ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক চার্লস ব্যাবেজ (Charles Babbage) ১৮১২ সালে লগারিদমিক হিসাবসহ গাণিতিক হিসাবের জন্য আরও উন্নত একটি ডিফারেন্স ইঞ্জিন তৈরির পরিকল্পনা করেন। আর্থিক অনুদান বন্ধের কারণে বিশ বৎসর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ১৮৩২ সালে তিনি এই কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তার পরিকল্পনার উপযুক্ত বিপুল পরিমাণ যান্ত্রিক সরজ্ঞাম তৈরি করাও সেই সময়ে সম্ভবপর ছিল না। এরপর ১৮৩৩ সালে ব্যাবেজ ‘‘এ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন’’ নামে একটি যান্ত্রিক কম্পিউটার তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং ইঞ্জিনের নকশা তৈরি করেন। সফল যন্ত্র তৈরি করতে বিলম্ব হওয়ায় সরকার অনুদান বন্ধ করে দিলেও ১৮৭১ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নিজ খরচে তনি গবেষণা চালিয়ে যান। ব্যাবেজের এ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনের পরিকল্পনায় আধুনিক কম্পিউটারের ধারণা ছিল। এজন্য ব্যাবেজকে কম্পিউটারের জনক বলা হয়।ব্যাবেজ আধুনিক কম্পিউটারের মত তার যন্ত্রে নিয়ন্ত্রণ অংশ, গাণিতিক অংশ, স্মৃতি, ইনপুট ও আউটপুট অংশগুলো চিহ্নিত করেন। স্মৃতি অংশে পঞ্চাশ অংক দৈর্ঘের এক হাজার সংখ্যা ধরানোর পরিকল্পনা ছিল।পরিকল্পনা অনুযায়ী পঞ্চাশ অংকের দুইটি সংখ্যার যোগ বা বিয়োগের জন্য এক সেকেন্ড এবং গুণের জন্য এক মিনিট সময় লাগার কথা ছিল।
চার্লস ব্যাবেজের এ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনের পরিকল্পনায় আধুনিক কম্পিউটারের ধারণা ছিল। এজন্য ব্যাবেজকে কম্পিউটারের জনক বলা হয়।
চার্লস ব্যাবেজের পরিকল্পনায় আধুনিক কম্পিউটারের ধারণা থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু সময় পূর্ব পর্যন্ত এ ব্যাপারে তেমন কোন অগ্রগতি সাধিত হয়নি। সত্যিকার অর্থে ১৯৪০ এর দশকে আধুনিক কম্পিউটার উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা চলে। ১৯৪০ সালে আমেরিকার বেল ল্যাবরেটরীর (Bell Laboratory) গণিতবিদ ও গবেষক ডঃ জর্জ আর স্টিবিজ (George R Stibitz) কমপেস্নক্স কম্পিউটার (Complex Computer) নামে একটি রিলে কম্পিউটার তৈরি করেন। ১৯৪০ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে অবস্থিত বেল ল্যাবরেটরীতে এই সফল যন্ত্রটি প্রদর্শন করা হয়। এরপর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের পর্ব শুরু হয়
ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল যন্ত্র দিয়ে।
ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল যুগ
কিছু কিছু ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশ যেমন ভালব আবিষ্কৃত হওয়ার পর কম্পিউটারের সংগে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশের ব্যবহার শুরু হয়।যান্ত্রিক ও ইলেক্ট্রনিক উভয় পদ্ধতির সমন্বয়ে গঠিত কম্পিউটারকে ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল কম্পিউটার বলে। আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ডঃ হাওয়ার্ড এইচ আইকেন (উৎ. ঐড়ধিৎফ ঐ অবরশবহ) ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিন (International Business Machine – IBM) কোম্পানিক চারজন প্রকৌশলী জে ডব্লিউ ব্রাইস , বি এম ডারফি (B M Darfee), এফ ই হ্যামিলটন (F E Hamilton) এবং সি ডি লেক (C D Lake) এর সহায়তায় Automatic Sequence Control Calculator (ASCC) নামে একটি ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করেন। ১৯৪৪ সালে আই বি এম মার্ক-১ নামে এটি বাজারজাত বা বিক্রয় করতে শুরু করেন। মার্ক-১ যন্ত্রের সাহায্যে জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করা যেত।
মার্ক-১ কম্পিউটারের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল-
১. মার্ক-১ পৃথিবীর প্রথম স্বয়ংক্রিয় গণনাযন্ত্র
২. এটির সাহায্যে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ এবং ত্রিকোণমিতিক ফাংশন ছাড়াও অনেক জটিল গাণিতিক কাজ করা যেত।
৩. এটির দৈর্ঘ ছিল ৫১ ফুট এবং উচ্চতা ছিল ৮ ফুট।
৪. এতে সাত লক্ষেরও অধিক যন্ত্রাংশ সংযোগের জন্য প্রায় ৫০০ মাইল লম্বা তার ব্যবহার করা হয়েছিল।
৫. এর ওজন ছিল প্রায় ৫ টন।
মার্ক-১ পনের বৎসর পর্যমত্ম চালু ছিল। এটি প্রদর্শনের জন্য বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সযত্নে সংরক্ষিত আছে।
ইলেক্ট্রনিক যুগ
যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানি ডঃ জন এ্যাটানাস্ফ্ তার নিজের এবং ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা কাজে সহায়তার জন্য ১৯৪২ সালে বায়ুশূন্য টিউব ব্যবহার করে একটি ছোট ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটার তৈরি করেছিলেন। এ্যাটানাস্ফ্ ও তাঁর সহকারী ব্যারীর নামানুসারে এই কম্পিউটারটি এ্যাটানাস্ফ্-ব্যারী কম্পিউটার (সংক্ষেপে ABC ) নামে পরিচিত। ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জন মউসলি (Dr. John W Mouchley) এবং তাঁর ছাত্র প্রেসপার একার্ট (Dr. J Presper Eckert) ইলেক্ট্রনিক নিউমেরিক্যাল ইন্টিগ্রেটর এন্ড ক্যালকুলেটর বা সংক্ষেপে ENIAC (Electronic Numerical Integrator And Calculator) নামক কম্পিউটারটি উদ্ভাবন করেন। ENIAC এর জন্য ১৫০০ বর্গফুট পরিমাণ স্থানের প্রয়োজন হত এবং এটির ওজন ছিল ৩০ টন। যন্ত্রটি ১৯০০০ বায়ুশূন্য ইলেক্ট্রনিক টিউব দিয়ে নির্মিত হয়েছিল এবং যন্ত্রটি চালনার জন্য ১৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন হতো। এই যন্ত্রটি নয় বৎসর চালু ছিল। এনিয়াক কম্পিউটারের প্রোগ্রামের জন্য তারযুক্ত প্লাগবোর্ড ব্যবহার করা হত। প্রোগ্রামিংয়ের জন্য তারের সংযোগ কম্পিউটারের পরিচালন কক্ষ বদলানোর প্রয়োজন হতো এবং শত শত সংযোগ বদলানোর জন্য কয়েকদিন পর্যন্ত সময় লেগে যেত। এই অসুবিধা দূর করার জন্য ১৯৪৯ সালে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মরিস উইলথিম সংরক্ষিত প্রোগ্রাম বিশিষ্ট প্রথম কম্পিউটার EDSAC (Electronic Delay Storage Automatic Computer) তৈরি করেন।
১৯৪৮ সালে ট্রানজিস্ট্রর (Transistor) আবিষ্কারের ফলে কম্পিউটারে নবযুগের সূচনা হয়। ভালবের পরিবর্তে ট্রানজিস্ট্রর ব্যবহারের ফলে কম্পিউটারের আকার ছোট হয়ে আসে এবং কর্মক্ষমতাও বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেট ইনষ্টিটিউট অব টেকনোলোজিতে হোয়ার্লউইন্ড-১ কম্পিউটার নির্মাণের কাজ শেষ হয় ১৯৫১ সালে।একই বৎসর ENIAC-এর নির্মাতারা UNIVAC (Universal Automatic Calculator) কম্পিউটারের নির্মাণ কাজ শেষ করেন। UNIVAC-ই সর্বপ্রথম বানিজ্যিক ভিত্তিতে নির্মিত ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটার। এই যন্ত্রে সর্বপ্রথম চুম্বক ফিতা ব্যবহার করা হয়েছিল। এর পর থেকেই কম্পিউটারের বানিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয় এবং সেই সংগে সংগে কম্পিউটার দ্রুত গতিতে বিস্তার লাভ করে।
0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions