এরিস্টটল
ইংল্যাণ্ডের খ্যাতনামা কবি কোলরিজ (Coleridge) বলেছিলেন “প্রত্যেক মানুষ হয় প্লেটোপন্থী হয়ে, হয় এরিস্টটলপন্থী হয়ে জন্মগ্রহণ করে। অনেকে আবার এ বক্তব্যকে সংশোধন করে বলেন, “প্রত্যেকে জীবনের এক পর্যায়ে হয় প্লেটোপন্থী এবং আর এক পর্যায়ে হয় এরিস্টটলপন্থী।” গ্রীক দর্শনের এ দুই মহাপণ্ডিতের গুণাবলী এতই সর্বজনীন এবং আমাদের চিন্তাধারার বৈশিষ্ট্য তাদের মতবাদে এমনভাবে বিন্যস্ত যে প্রায় প্রত্যেকে আমরা মানসিকতার দিক দিয়ে হয় প্লেটোপন্থী, না হয় এরিস্টটলপন্থী। কেউ প্লেটোর ন্যায় সাধারণ থেকে নির্দিষ্ট (general to particular), আবার কেউ এরিস্টটলের ন্যায় নির্দিষ্ট থেকে সাধারণ (particular to general) সূত্রে উপনীত হয়। কেউ অনুসরণ করে প্লেটোর অবরোহ পদ্ধতি (deductive)। আবার কেউ এরিস্টটলের আরোহ পদ্ধতি (Inductive) অনুসরণ করে।
সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল-এই মহান ত্রয়ী (trio) জ্ঞান-ভাণ্ডারের অমূল্য সম্পদ এবং তাদের তুলনা সাধারণত মেলে না। জোর করে তুলনা করতে চাইলে কিছুটা নমুনা মেলে জার্মান দার্শনিক ফিটে (Fichte), কান্ট (Kant) এবং হেগেলের সাথে অথবা মার্কস, লেনিন ও স্ট্যালিনের সাথে।
অসংখ্য পণ্ডিত এ মত প্রকাশ করেছেন যে, এরিস্টটল, জ্ঞানীদের গুরু’ (“the master of them that know")। সমগ্র অতীতকালে এত গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং এত বড় উন্নত মন (encyclopedic mind) আর একটিও দেখা যায় না। অনেকে আবার মনে করেন, তিনি এত প্রশংসার দাবিদার নন। তবে এ কথা ভুললে চলবে না, এত বিভিন্ন বিষয়বস্তুর উপর এমন ব্যাপকভাবে এত পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য খুব কম লোক পেশ করেছেন এবং বিদ্যাবত্তার চূড়ান্ত আদালতে তার যে প্রাধান্য তা একক, অপূর্ব এবং অনবদ্য। যুক্তিবিদ্যার উপরে তিনি যা বলেছেন, যান্ত্রিক কলা-কৌশল (mechanics) সম্পর্কে তিনি যা প্রকাশ করেছেন, পদার্থবিদ্যা ও জীববিদ্যা সম্পর্কে তিনি যে বক্তব্য রেখেছেন, জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে তার যে মতামত, দর্শন ও নীতিশাস্ত্র সম্পর্কে তার যে অভিমত, চারুকলা ও কাব্যের উপরে তার যে বক্তব্য, বিশেষ করে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কে তার যে সিদ্ধান্ত কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত তা চূড়ান্ত বলে গৃহীত হয়েছে। তার তথ্য ছিল নিখুঁত। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বচ্ছ এবং সুতীক্ষ্ণ। তার সিদ্ধান্ত ছিল অজেয়। তার তুলনাহীন পাণ্ডিত্যের ছাপ রয়েছে তাঁর গ্রন্থের প্রতি ছত্রে। গ্রীক দর্শন ও সংস্কৃতির অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র এরিস্টটল। প্রাচীনকালে তিনি ছিলেন অনেকটা সবজান্তার মত। তিনি পৃথিবীর সর্বপ্রথম রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
এরিস্টটলের জন্ম হয় প্রেসের (Thrace) উপকণ্ঠে স্টাগিরা (Stagira) শহরে খ্রিঃ পূঃ ৩৮৪ সনে। তিনি এথেন্সের আদি অধিবাসী ছিলেন না, যদিও এ শহরে জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কাটিয়েছিলেন। প্লেটোর ন্যায় তিনি অভিজাত বংশের সন্তান ছিলেন না। তবে তার পিতার অবস্থা ছিল সচ্ছল। তার পিতা নিকোমেকাস (Nichomachus) ছিলেন ম্যাসিডন অধিপতির চিকিৎসক। তাঁর সম্পদ ছিল এবং তিনি নিজ সন্তানকে দেশের সর্বাপেক্ষা সম্ভ্রান্ত শিক্ষায়তনে শিক্ষা দিতে আগ্রহী ছিলেন। তার | পিতা ও অন্যান্য চিকিৎসকদের অধীনে তিনি চিকিৎসা বিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। খ্রিঃ পৃঃ ৩৬৬ সনে তার পিতার মৃত্যু হলে তিনি ১৮ বছর বয়সে এথেন্সে আসেন ও প্লেটোর স্বনামখ্যাত শিক্ষায়তন একাডেমির (Academy) ছাত্র হন। তখন প্লেটোর বয়স ছিল ৬২ বছর। এক প্রতিভাবান ছাত্র হিসেবে তিনি প্লেটোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্লেটো তাকে একাডেমির ‘মধ্যমণি’ বলতেন। এখানে তিনি সুদীর্ঘ ২৪ বছর শিক্ষা লাভ করেন। সকলে আশা করেছিলেন প্লেটোর মৃত্যুর পর তিনি একাডেমির প্রধান হবেন। কিন্তু অবশেষে তিনি নিরাশ হলেন। প্লেটোর স্থলাভিষিক্ত হলেন প্লেটোর ভ্রাতুস্পুত্র সুসিপ্লাস (Spusippus)। এতে তিনি দুঃখিত হন এবং এথেন্স ত্যাগ করে এশিয়া মাইনরে এক স্বৈরাচারী শাসক হার্নিয়াসের (Hermias) চিকিৎসক ও তাঁর উপদেষ্টা হিসেবে চাকরি গ্রহণ করেন। খ্রিঃ পূঃ ৩৪২ সনে ম্যাসিডনের রাজা ফিলিপ তাঁর পুত্র আলেকজাণ্ডারের গৃহশিক্ষক হিসেবে তাকে আহবান করেন। এখানে তিনি কয়েক বছর অবস্থান করেন এবং খ্রিঃ পূঃ ৩৩৬ সনে এথেন্সে ফিরে আসেন। লাইসিয়ামের মন্দির পার্শ্বে প্লেটোর একাডেমির মত তার বিশ্ববিদ্যালয় ‘লাইসিয়ামের (Lyceum), ভিত্তি স্থাপন করেন। এখানে তিনি সুদীর্ঘ বার বছর পর্যন্ত শিক্ষকতা কাজে নিয়োজিত থাকেন। আলেকজাণ্ডারের মৃত্যুর পর এথেন্সে বিদ্রোহ দেখা দিলে তার বিরুদ্ধে অসতর্কতার অভিযোগ আসে, যেমনটি এসেছিল সক্রেটিসের বিরুদ্ধে। তখন তিনি এথেন্স ত্যাগ করে চ্যালসিস (Chalsis) নামক স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং কিছুদিন পরে খ্রিঃ পূঃ ৩২২ অব্দে মৃত্যুবরণ করেন।
এরিস্টটলের লেখনী ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তার প্রতিভা ছিল বহুমুখী। গুণের বিভিন্ন শাখায় ছিল তার অবাধ বিচরণ। তিনি একদিকে যেমন নীতিশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য এবং | অর্থনীতির উপর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেন, অন্যদিকে তেমনি পদার্থবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, শরীরবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কেও অনেক সৃষ্টিধর্মী আলোচনা করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার দান অপরিসীম। এজন্য তাঁকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক (Father of Political Science) বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ ক্ষেত্রে তার রচিত ‘রাজনীতি’ (The Politics) গ্রন্থটি একটি অমর গ্রন্থ। তাছাড়াও তিনি ‘দি কনস্টিটিউশন অব এথেন্স' (The Constitution of Athens) এবং ‘দি কনস্টিটিউশনস' (The Constitutions) গ্রন্থও লেখেন। “দি পলিটিক্স' গ্রন্থে তার বিশ্বগ্রাসী এক মনের (encyclopedic mind) পরিচয় পাওয়া যায়।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions