অস্থিসন্ধি রোগ
অস্থিসন্ধিরোগ (joint disease): দেহের সংযোজক কলা অস্থি ও অস্থিসন্ধির রোগসমূহকে সাধারণভাবে রিউমেটিক রোগ বা বাতরোগ বলা হয়, যদিও এই নামকরণের বিষয়েও সবাই একমত নন। এসব রোগের প্রধান লক্ষণ দেহকাঠামোর বিভিন্ন অংশে ব্যথা ও জড়তা; ফলে সংশ্লিষ্ট অংশের তৎপরতা হ্রাস । বর্তমানে এই সব রোগ প্রধানত রোগতাত্ত্বিক ভিত্তিতে প্রদাহী, বিপাকীয় এবং অবক্ষয়ী এই তিন গ্রুপে চিহ্নিত করা হয় । | প্রদাহজনিত রোগের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রিউমেটয়েড সন্ধিপ্রদাহ (rheumatoid arthritis) এবং সংক্রমণজনিত সন্ধিপ্রদাহ। বিপাকীয় গোলযোগের কারণে সৃষ্ট রোগের মধ্যে রয়েছে বহুপরিচিত গাউট বা গেঁটে বাত । অন্য দিকে অবক্ষয়ী রোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অস্টিওআথ্রোসিস (Osteoarthrosis) এবং স্পন্ডাইলোসিস (spondylosis)। এগুলোর প্রাদুর্ভাব মোটেই কম নয়। আমাদের দেশে সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব সত্ত্বেও বিদেশি পরিসংখ্যানে এদের গুরুত্ব বোঝা যায়। ব্রিটেনের মতো স্বল্প জন বসতির দেশেও বছরে দুই কোটি লোক বিভিন্ন ধরনের রিউমেটিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। রিউমেটয়েড সন্ধিপ্রদাহের কারণ স্পষ্ট নয়। তবে এতে অনাক্রম্যতাত্ত্বিক কারণ বিশেষ ভূমিকা নিয়ে থাকে বলে আজকাল মনে করা হচ্ছে। সাধারণত হাত-পায়ের আঙুলের সন্ধি এই রোগে আক্রান্ত হয়। সন্ধিগুলো গরম হয়, ফুলে ওঠে এবং নাড়াচাড়ায় ব্যথা অনুভূত হয়। সঙ্গে জ্বরও থাকে। লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে দেখা দেয়; দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সন্ধিগুলোর গঠনবিকৃতি। যে কোনো বয়সে এই রোগ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসায় নিরাময় ঘটে না, তবে লক্ষণের সাময়িক উপশম ঘটে এবং রোগের অগ্রগতি কমে আসে।
সংক্রমণজনিত সন্ধিপ্রদাহ আকস্মিকভাবে দেহের যে কোনো সন্ধিতে দেখা দিতে পারে । সন্ধিতে আঘাত বা ইনজেকশন, দেহে অস্ত্রোপচার এবং অনুরূপ পটভূমিতে জীবাণু সংক্রমণের কারণে সন্ধিপ্রদাহ প্রকাশ পায়। জ্বর, সন্ধিবেদনা, সন্ধিস্ফীতি সচরাচর লক্ষণ। বিভিন্ন ধরনের জীবাণু এই সংক্রমণে অংশ নিয়ে থাকে । উচ্চমাত্রায় সঠিক অ্যান্টিবায়োটিকের দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা | এবং সন্ধির বিশ্রামে সুফল পাওয়া যায় ।
দেহে প্রোটিনজাতীয় পিউরিন উপাদানের বিপাকক্রিয়ার গোলযোগ গাউট-এর প্রধান কারণ। এই রোগে রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং তা সন্ধির কোমলাস্থিতে সঞ্চিত হতে থাকে। গাউট কমবয়সীদের রোগ । পরিবেশ ও বংশগত ত্রুটি এর কারণ বলে বিবেচিত। হাত-পায়ের, বিশেষ করে পায়ের আঙুলের সন্ধি সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। জানু, গোড়ালি, কনুইসন্ধিও আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত সন্ধি উত্তপ্ত ও রক্তিম হয়ে ওঠে। ফোলা সন্ধিতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। সঙ্গে জ্বর এবং আনুষঙ্গিক লক্ষণ উপস্থিত | থাকে। ইউরিক অ্যাসিডের রেচনবর্ধক ও বেদনানাশক ঔষধে রোগের উপশম ঘটে।
অস্টিওআথ্রাসিস বার্ধক্যের রোগ । মেরুদণ্ড, | কঁধ, জানু ইত্যাদি ভারবহনকারী সন্ধি সর্বাধিক আক্রান্ত হয় সন্ধির কোমলাস্থি ও অন্যান্য অংশ অবক্ষয়ের | ভবে ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে রোগের প্রকাশ ঘটায় । ক্ষয়ের পাশাপাশি নতুন অস্থি ও সংযোজক কলার গঠন অস্থিসন্ধিতে অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে। অস্টিওআথ্রোসিসের কারণও সঠিকভাবে জানা যায়। এ রোগের প্রধান লক্ষণ সন্ধিতে ব্যথা, ক্রমে সন্ধি ব্যবহারে অসুবিধা । এই দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত সন্ধির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়ে যায় এবং সন্ধি আর ব্যবহারযোগ্য পর্যায়ে থাকে না। এর সন্তোষজনক কোনো চিকিৎসা নেই । বেদনানাশক ব্যবহার ও সংশ্লিষ্ট পেশির ব্যায়াম রোগের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে মাত্র। গ্রীবাদেশের কশেরুকায় এই অবক্ষয়ী প্রক্রিয়া সচরাচর দেখা যায়, নাম সার্ভাইকাল (গ্রীবাদেশীয়) স্পন্ডাইলোসিস। যেমন দেখা যায় কটিদেশের কশেরুকায় (সাধারণ নাম লাম্বাগো), তেমনি কাধের সন্ধিতে (shoulder joint)। শেষোক্ত অবস্থাটির সাধারণ নাম ‘ফ্রোজেন শোল্ডার’ । আক্রান্তসন্ধিতে এসব ক্ষেত্রে তাপপ্রয়োগ (‘আলট্রাভায়োলেট' কিংবা ‘শর্টওয়েভ') এবং ব্যায়াম অবস্থা আয়ত্তে রাখে, ব্যথার উপশম ঘটায়।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions