প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থা
প্লেটো যে ‘আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করেন, তা বাস্তবায়িত করার জন্য তিনি বিশিষ্ট এক শিক্ষাপদ্ধতি প্রবর্তনের ব্যবস্থা করেন। তাঁর শিক্ষা পদ্ধতির বৈচিত্র্য এবং যৌক্তিকতায় মুগ্ধ হয়ে ফরাসী দার্শনিক রুশশা (Rousseau) তার ‘দি রিপাবলিক' গ্রন্থটিকে শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট এক মহান আলেখ্য বলে আখ্যায়িত করেন।
মূলত তার শিক্ষা পদ্ধতি ছিল প্রগতিশীল। অনেক বিজ্ঞজন তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘মহান বস্তু (“A great thing") বলে উল্লেখ করেন। সমগ্র জীবনের ব্যাপ্তি সমন্বয়ে তার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণীত। আসলে তিনি সাম্যবাদের চেয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার উপরই অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। ন্যায়নীতি ভিত্তিক প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের মূল ছিল শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষার মাধ্যমে মানব মনকে সুনিয়ন্ত্রিত করে আদর্শ রাষ্ট্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে প্লেটো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। | প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র (Ideal State) শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব অত্যধিক। এই শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তনের মূল লক্ষ্য ছিল শাসনক্ষেত্রে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সংযোজন। অধ্যাপক বার্কারের কথায়, ‘তা (শিক্ষা ব্যবস্থা) মানসিক ঔষধের মাধ্যমে মানসিক রোগ নিরাময়ের এক উদ্যোগ" (" It is an attempt to cure a mental malady by mental medicine”)। দার্শনিক রুশশা (Rousseau) প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থায় মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “প্লেটোর “রিপাবলিক' গ্রন্থটি শিক্ষা ব্যবস্থার উপর লিখিত সর্বাপেক্ষা উত্তম আলেখ্য” ("The Republic is the finest treatise on education that was ever written")
তিনি নিয়ন্ত্রিত এক বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন (A state controlled system of compulsory education)। প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়বস্তু ছিল দ্বিবিধ। প্রথম, শরীর গঠনমূলক (gymnastics), দ্বিতীয়, মন উন্নয়নমূলক (music)।
শরীর গঠনমূলক বিষয়সমূহে নাগরিকদের শরীর চর্চা তথা দৈহিক গঠনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। মন উন্নয়নমূলক বিষয়সমূহে নাগরিকদের মানসিক বিকাশ সাধনের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল সর্বসাধারণের জন্য, কিন্তু মনোনীত শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। উচ্চ শিক্ষার বিষয়বস্তুতে অন্তর্ভূক্ত ছিল অংকশাস্ত্র, জ্যোতিবিদ্যা, দর্শন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্বন্ধীয় বিদ্যা।
প্লেটো তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে দু ভাগে বিভক্ত করেন ঃ (ক) প্রাথমিক শিক্ষা, ও (খ) উচ্চ শিক্ষা। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেক বালক ১২ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যায়াম, সংগীত, কাব্য ও সাহিত্য বিষয়ে শিক্ষা লাভ করবে। তার পর ২০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রত্যেক যুবককে যুদ্ধ বিদ্যায় নৈপুণ্য অর্জন করতে হবে।
উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে ২০ বছর বয়স থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত তারা উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে অধিকতর জটিল বিদ্যায় জ্ঞান অর্জনে মনোনিবেশ করবে। এ সময়ে তারা গণিতশাস্ত্র, জ্যোর্তিবিজ্ঞান ও তর্কশাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন করবে ও দার্শনিক তত্ত্বসমূহ আয়ত্তে আনয়ন করবে। এই পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে রাষ্ট্র শাসন পরিচালনার বিভিন্ন বিভাগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচন করা হবে। এ পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ শাসন পরিচালকদের মধ্যে দার্শনিক জ্ঞান ও ধ্যান-ধারণার উন্মেষের চেষ্টা করা হবে, যাতে, তারা ভবিষ্যতে দার্শনিক শাসকরূপে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন।
৩৫ বছর কাল শিক্ষা সমাপ্ত হলে শিক্ষার্থিগণ দায়িত্বপূর্ণ উচ্চপদসমূহে অধিষ্ঠিত হবেন এবং যারা এ পর্যায়ের শিক্ষায় দক্ষতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হবেন তারা অধঃস্তন পদে নিযোজিত হবেন। তবে এই পর্যায়ই শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি নয়। দায়িত্বপূর্ণ পদে নিযোজিত হবার পরেও ১৫ বছর কাল তারা শিক্ষা গ্রহণ করবে। এই শিক্ষা হবে ব্যবহারিক, বাস্তব ও প্রাযোগিক। বিভিন্ন কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে অভিজ্ঞতাপ্রসূত যে শিক্ষা তাই এই পর্যায়ের মৌল শিক্ষা। এভাবে প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রে অভিভাবকদের সমগ্র জীবন প্রলম্বিত এক শিক্ষা ব্যবস্থার বিধান দিয়েছেন। এ শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যক্তি নিয়ন্ত্রিত বা বেসরকারি নয়। তা রাষ্ট্র কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত (state controlled) ও সরকারি।
প্লেটো বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র মানব মনের সৃষ্টি। রাষ্ট্রের মাধ্যমেই নাগরিকবৃন্দ উচ্চতর নৈতিকতা, তীব্র বুদ্ধিমত্তা ও গভীর দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হয়। তাই রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি এত বেশি গুরুত্ব আরোপ করেন।
বহু বছর পূর্বে এভাবে প্লেটো তাঁর ‘আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য এক আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন। তার এই শিক্ষা ব্যবস্থা এমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও যুক্তিযুক্ত যে, বর্তমান যুগেও একে অনুসরণের চেষ্টা চলছে। তিনি মানসিক শিক্ষার উপর যেমন গুরুত্ব আরোপ করেন তেমনি শিক্ষার্থীদের শারীরিক গঠন ও সামর্থ্য অর্জনের উপরেও জোর দিয়েছেন। কোন জটিল আধ্যাত্মিক বিষয়ে মনোনিবেশ করতে গেলে দার্শনিকের শরীর ও মন উভয়ই প্রফুল্ল থাকা প্রযোজন।
প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার অভিনবত্ব সম্পর্কে অবশ্য কোন কোন লেখক মত প্রকাশ করেন যে, এ ব্যবস্থা নতুন নয়। অধ্যাপক স্যাবাইনের (Sabine) কথায়, “এটি ছিল এথেন্স (Athens) নগরীর তরুণদের যে শিক্ষা দেয়া হতো তার সাথে স্পার্টা নগরীর (Sparta) রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থার সংমিশ্রণ। তবে শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়বস্তু প্লেটো ভয়ঙ্করভাবে পুনর্বিন্যস্ত করেন" ("Combining the training usually given to the son of an Athenian gentleman with the state controlled-training given to a youthful Spartan");
এ প্রসঙ্গে এও উল্লেখযোগ্য, প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল এক অভিজাত শিক্ষা ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্র কর্তৃক সর্বতোভাবে নিয়ন্ত্রিত। নাগরিকদের স্বাধীন ও সহজাত অগ্রগতিতে এ ব্যবস্থা তেমন সহায়ক ছিল না। এতে এক প্রকার রক্ষণশীলতা বিদ্যমান ছিল। তা ছিল অনেকটা গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী।
এ ব্যবস্থা বিভিন্ন দিক থেকে সমালোচিত হয়েছে:
প্রথম, এ শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত। ফলে এ ব্যবস্থা ছিল সর্বাত্মক।
দ্বিতীয়, এ ব্যবস্থা মোটেই গণতান্ত্রিক ছিল না। আদর্শ রাষ্ট্রের সকল শ্রেণীর জন্য তা প্রযোজ্য ছিল । শুধু শাসকশ্রেণী ও সৈনিক শ্রেণী এর সুবিধা লাতে সক্ষম হতো। উৎপাদক শ্রেণীর জন্য এ ব্যবস্থায় কোন ব্যবস্থা ছিল না।
তৃতীয়, এ শিক্ষা ব্যবস্থা সময় ও অন্যান্য দিক থেকে ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সারাজীবনব্যাপী শিক্ষা এ ব্যবস্থায় স্থির করা হয়।
চতুর্থ, এই ব্যবস্থায় বৃত্তিগত ও প্রাযোগিক শিক্ষার উপর কোন গুরুত্ব আরোপ করা হয় নি। বেঞ্জামিন জোয়েট (Benjamin Jowett) বলেন, এ ব্যবস্থায় ছিল সঙ্গীতের অভূতপূর্ব প্রযোগ। তাছাড়া এ ব্যবস্থায় দেহের উপর আত্মার সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
সর্বশেষে, এও বলা যায়, প্লেটোর এই শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সংকীর্ণ। সামাজিক প্রেক্ষিতে তা পুরাপুরি কার্যকর ছিল না। ব্যক্তির দিক থেকে এটি অবাস্তব ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে ছিল অগণতান্ত্রিক।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions