রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে পার্থক্য
মানুষের সামাজিক সম্পর্কের সামগ্রিকতাকে সমাজ বলা হয়। সমাজ মানুষের এরূপ একটি সাধারণ প্রতিষ্ঠান যা পারস্পরিক সকল সম্বন্ধকে অন্তর্ভুক্ত করে। সমাজ সকল সংঘ ও প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে। রাষ্ট্র এর এক প্রধান সংগঠন। রাষ্ট্র তাই সমাজের মধ্যে অবস্থান করে, কিন্তু রাষ্ট্রের মধ্যে সমাজের সামগ্রিক রূপ ফুটে ওঠে না। সুতরাং সমাজ রাষ্ট্র অপেক্ষা বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান। সমাজ মানুষের এরূপ সামাজিক সম্পর্কসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত করে না, যথা—ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। এগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যাপার নয়। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য প্রধানত মানুষের রাজনৈতিক কার্যাবলি ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু সমাজের উদ্দেশ্য সামগ্রিক। উভয়ের মধ্যে অবশ্য গভীর ঐক্যসূত্র বিদ্যমান। কিন্তু দুইএর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
প্রথম, রাষ্ট্র অপরিহার্যরূপে একটি আঞ্চলিক এবং ভৌগোলিক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু সমাজের সাথে কোন ভৌগোলিক অঞ্চলের সম্পর্ক অপরিহার্য নয়। রাষ্ট্র বিশেষ কোন ভূ-খণ্ডের সীমানায় আবদ্ধ, কিন্তু রোমান ক্যাথলিক চার্চ এবং জাতিসংঘের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কোন বিশেষ রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ নয়। সমগ্র বিশ্বে তাদের কর্মপ্রচেষ্টা ব্যাপ্ত। উদাহরণস্বরূপ, মুসলমান সমাজ, হিন্দু সমাজের উল্লেখ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়, সমাজ রাষ্ট্রের মত সুসংগঠিত নয়। সমাজ সংগঠিত হতে পারে, আবার তার কোন সংগঠন নাও থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র সুসংবদ্ধ, সুসংগঠিত এবং পূর্ণরূপে সংহত। রাষ্ট্রই সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শান্তি ও শৃংখলা বজায় রাখে।
তৃতীয়, রাষ্ট্রই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী এবং অন্যায়ের গুরুত্বভেদে নাগরিকদের উপর মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দিতে পারে। রাষ্ট্র মানুষের কার্যাবলি বিধিবদ্ধ আইন-কানুন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সমাজ মানুষের কার্যাবলিকে নিয়ন্ত্রণ করে সামাজিক প্রথা এবং অভ্যাস দ্বারা। সামাজিক প্রথা বা পদ্ধতি ভঙ্গকারীর উপর সমাজ বল প্রয়ােগ করার বা শারীরিক শাস্তি প্রদানের অধিকারী নয়। সমাজের প্রতি মানুষের কর্তব্যবোধ, সহযোগিতামূলক মনােভাব, সামাজিক নিন্দার ভয় প্রভৃতির জন্য মানুষ সামাজিক নিয়ম ও প্রথা মেনে চলে।
চতুর্থ, রাষ্ট্রের কার্য কী হবে, তা সামাজিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। গ্রীক পন্ডিতদের মতে, রাষ্ট্র ছিল সর্বাত্মক এবং সর্ববৃহৎ সংগঠন। মধ্যযুগে ইউরোপে রাষ্ট্রীয় কার্যক্ষেত্রকে সঙ্কুচিত করা হয়েছিল তৎকালীন সামাজিক পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে। একনায়কতন্ত্রের আমলে রাষ্ট্রকে আবার সর্বাত্মক বলে ঘোষণা করা হয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্র একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে জনকল্যাণকর সকল কার্য সম্পাদিত হয়। সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে রাষ্ট্রের কার্যক্ষেত্র সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়।
পঞ্চম, রাষ্ট্র মূলত মানুষের রাজনৈতিক জীবনকে কেন্দ্র করে কার্যপ্রণালী নির্ধারিত করে, কিন্তু সমাজ হচ্ছে সামাজিক সম্পর্কের সামগ্রিক রূপ”। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক ও অন্যান্য দিক সহযোগে সামাজিক কর্ম পরিব্যাপ্ত, কিন্তু রাষ্ট্রের কর্মপরিধি সাধারণত মানুষের রাজনৈতিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।
ষষ্ঠ, সমাজের পরিধি রাষ্ট্র অপেক্ষা বৃহত্তর। সমাজের কার্যক্রম বিশ্বময় পরিব্যাপ্ত হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের কার্যধারা এক নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ডের মধ্যেই সাধারণভাবে সীমিত থাকে। সমাজ যেন বিরাট এক বটবৃক্ষ এবং রাষ্ট্র সে বৃক্ষের বৃহত্তম শাখা তুল্য।
সর্বশেষে, সময়ের দিক থেকেও রাষ্ট্র অনেক নবীন, কিন্তু সমাজের জন্ম হয়ছে রাষ্ট্রের জন্মের বহু | পূর্বে। রাষ্ট্র যেন সমাজের পৌত্র বা প্রপৌত্র।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions