রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য
সরকার ও রাষ্ট্রকে অনেক সময়ে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। ফলে উভয়ের অর্থ সম্বন্ধে অনেক ভ্রান্তি এবং ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করা হয়েছে।
প্ৰথম, রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত সংস্থা। কিন্তু সরকার এরূপ একটি প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ইচ্ছা গঠিত হয়, প্রকাশিত হয় এবং কার্যকর হয়। রাষ্ট্র গঠনে চারটি উপাদান- জনসমষ্টি, ভূ-খণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌম ক্ষমতা অপরিহার্য। কিন্তু সরকার উক্ত চারটি উপাদানের অন্যতম। রাষ্ট্রকে মানবদেহের সাথে তুলনা করলে সরকারকে আমরা তার মস্তিষ্ক বলে ধরতে পারি।
দ্বিতীয়, রাষ্ট্র অনেক ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। বাস্তবক্ষেত্রে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের অন্তর্ভূক্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সরকার গঠিত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে যারা জড়িত থাকেন, তারাই সরকারি লোক। কিন্তু রাষ্ট্র গঠনে জনসমষ্টির প্রত্যেকেই অংশীদার। সরকারের সদস্য থেকে আরম্ভ করে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত সকলেই রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। শাসক এবং শাসিত সকলেই রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক।
তৃতীয়, রাষ্ট্র একটা তত্ত্বগত ধারণা। রাষ্ট্রকে কল্পনা করতে হয়। রাষ্ট্রের ছবি চোখে দেখা যায় না, কারণ তা একটি তত্ত্বগত ধারণা (Abstract)। সরকার কিন্তু রাষ্ট্রের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য (Concrete) রূপ। রাষ্ট্রের ইচ্ছা সরকারের মাধ্যমেই প্রকাশিত এবং কার্যকর হয়। বিশিষ্ট লেখকের মতে, “সরকারের সাথে জাহাজের ‘হাল’ শব্দটির যথেষ্ট সম্পর্ক রয়েছে ("The word government', judged by its philological derivation, apparently has a close affinity to tne rudder or steering of a ship")। হাল ব্যতীত যেমন কর্ণধারের পক্ষে জাহাজ চালানো সম্ভব হয় না, ঠিক তেমনি সরকার না থাকলে জনতা বিশৃংখল হয়ে পড়ে এবং সুষ্ঠুভাবে কোন কাজই তাদের দ্বারা সম্ভবপর হয় না।
চতুর্থ, রাষ্ট্র একটি ভাবগত ধারণা বলে সর্বদেশে এবং সর্বকালে তার স্বরূপ এক এবং অভিন্ন। চারটি উপাদানে গঠিত এ সংস্থা সর্বযুগে এক। কিন্তু সরকার বিভিন্নরূপে প্রকাশিত। অনেক সময় রসিকতা করে সরকারকে ‘বহুরূপী'ও বলা হয়। কারণ রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, সমাজতন্ত্র প্রভৃতি বিভিন্ন বেশে সরকারকে দেখা যায় সামাজিক পরিবেশ এবং পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে।
পঞ্চম, রাষ্ট্র অনেকটা চিরন্তন, চিরস্থায়ী এবং নিত্য। বৈধ উপায়ে নোক অথবা অন্তর্বিপ্লবের ফলেই নোক, সরকারের পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের কোন পরিবর্তন হয় না উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়ায় যখন রাজতন্ত্র নিশ্চিহ্ন হয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন রুশ রাষ্ট্রের কোন পরিবর্তন হয়নি। সরকার আসে, যায়, বিলুপ্ত হয়। নতুন সরকার পুরাতন সরকারের স্থান অধিকার করে। কিন্তু রাষ্ট্রের বিলোপ কিছুতেই ঘটে না।
যষ্ঠ, রাষ্ট্র আইনগত সকল অধিকারের উৎস। ফলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাগরিকদের কারো কোন অধিকার নেই। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাওয়ার অর্থ নিজের সামাজিক জীবনের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেকে বিপন্ন করা। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অধিকার রয়েছে। সরকার কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অধিকারে হস্তক্ষেপ করলে তার বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত দায়ের করা সম্ভব।
সপ্তম, রাষ্ট্র একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার সীমাহীন ক্ষমতা আছে। সরকারের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ এবং রাষ্ট্রকর্তৃক প্রদত্ত। এ সম্পর্কে অধ্যাপক লাস্কির (Laski) কথা উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, “ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সরকার রাষ্ট্র” (“The state for all practical purposes is the government”)। আইনের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র অপ্রত্যক্ষ, স্পর্শের উর্ধ্বে, অপরিবর্তনীয়, আদর্শ ব্যক্তিস্বরূপ এবং সরকার তার প্রতিনিধি মাত্র। | অষ্টম, রাষ্ট্র একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান। সার্বভৌম ক্ষমতা রাষ্ট্রের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। সরকারের কিন্তু নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা সরকারের মাধ্যমে প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হয়। এ অর্থে সরকারের ক্ষমতা সীমিত এবং সংবিধানের মাধ্যমে এ সীমারেখা নির্দিষ্ট হয়।
সর্বশেষে, রাষ্ট্র একটি ভৌগোলিক (territorial) সংস্থা, কিন্তু সরকার এই সংস্থার সংগঠিত (organized) অংশ। সাংগঠনিক দিকটি সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions