আম

আম

আম (Mango): ভারতীয় উপমহাদেশ আমের জন্মস্থান। ভালো জাতের পাকা আমের স্বাদের তুলনা নেই। আবার টক ও পোকায় ধরা আমও কম নেই। আমাদের দেশে খাওয়ার উপযোগী উন্নত শ্রেণিতে পড়ে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিছু আম । এই সুস্বাদু জাতের আমের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা (Mangifera indica Linn), গোত্র আনাকার্ডিয়াসি (Anacardiaceae)। রাজশাহী থেকে পুব দিকে আম ক্রমশ টক হতে থাকে । নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের আম আরো টক আর পোকারা। এই জাতের আমকে বলা হয় খাওয়ার অনুপযুক্ত এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা সিলভাটিকা (Mangifera sylvatica Roxba)। লতানে আমও এই পর্যায়ে পড়ে । পার্বত্য চট্টগ্রাম, আসাম, ত্রিপুরা এই আমের অঞ্চল। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বৌদ্ধ জাতক গ্রন্থে আমের কাহিনী পাওয়া যায় ।

এঙ্গলার ও গ্র্যান্টস নামের দুই উদ্ভিদতত্ত্ববিদ ১৮৯৭ সালে ৩২ প্রকারের রসাল আমের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। ১৮৯৫ সালে হুকার ও জ্যাকস করেছিলেন ৩৫ প্রকারের সুস্বাদু আমের তালিকা। ১৯৪৯ সালে ভারতীয় আম্রতত্ত্ববিদ মুখার্জি ৪১ রকমের সুখাদ্য আমের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন। এখন আমেরিকার ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়া, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ, মালটা, আফ্রিকার নাটাল ও মিশরে এবং অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে আম উৎপন্ন হচ্ছে। একমাত্র বাংলাদেশ ও ভারতে অন্তত ৫০০ রকমের আমের বর্ণনা পাওয়া যায় । তবে এসবের মধ্যে অনেক আমের একটি থেকে আরেকটি তফাত করা খুব মুশকিল। | জামালপুরে ১৩০০ থেকে ১৩২৯ সন পর্যন্ত ঈশ্বরচন্দ্র গুহের একটি নার্সারি ছিল। সেই নার্সারিতে ১২৮ জাতের আমের চারা পাওয়া যেত। তার মধ্যে উৎকৃষ্ট জাতের আমের তালিকায় বোম্বাই আলফানসো (বা আলফানজো) ছিল । এই আম ঘরে অনেক দিন রাখা যেত, পাকত জুলাই মাসে। তখন ঐ আমের একটি চারার দাম ছিল ৫০ পয়সা। সারা বছর ফলদায়ী বা বারোমেসে আমের প্রতিটি চারার দাম ছিল ১০ টাকা । সে সময়কার বিখ্যাত আম ছিল- বৃন্দাবনী, দুধিয়া, গোপালভোগ, ফজলী, খীসপাতি, কোহিতুর, মোহনভোগ, শ্রীধন, পিয়ারী, ল্যাংড়া, ফার্নান্ডিয়ান, আগা সাহেব, বাদানী, জালীবান্দা, বেগমপসন্দ, কাঁচামিঠা, বেনারস, কাঁচামিঠা-ঈশ্বর গুহ, কালাপাহাড়, মালদহসিঙ্গাপুর, মুলতানি । এর মধ্যে কয়েকটি আম ছিল বারোমেসে । এখন আমাদের দেশে মাদ্রাজ অঞ্চল থেকে মাঘ-ফারুন মাসে আম আসে আমদানি হয়ে ।

চাষ করা আমের মধ্যে বোম্বাইয়ের আলফানসো উৎকৃষ্ট আমের তালিকার শীর্ষে রয়েছে। বিশ্বের বাজারে এই আমের খুব চাহিদা। বাংলাদেশে হিমসাগর, হাড়িভাঙ্গা, গুলাবখাস, বোম্বাই ও ল্যাংড়াকে উৎকৃষ্ট আম বলা হয়। কেউ কেউ ফজলীকে এই শ্রেণিভুক্ত করেন। এ ছাড়া মাদ্রাজসহ দক্ষিণ ভারতে নীলাম ও বাঙ্গানপল্লী; অন্ধ্রে মালগোয়া ও সুবর্ণরেখা; যুক্তপ্রদেশ ও বিহারে চৌসা, দশেরী ও ল্যাংড়া প্রসিদ্ধ । আকারের দিক থেকে বাংলাদেশে ফজলী সবচেয়ে বড়, ওজনে কোনো কোনোটি ১.৫ কেজি। ভারতের অন্ধ্রের টেনেরু লম্বায় ২০ সেমি ও ওজন ১.৬ কেজি, তবে সেই আম সুস্বাদু নয় ।

কবিরাজি ভাষায় কচি আম রক্তপিত্তকর, ডাসা আম পিত্তকর এবং পাকা আম শরীরের রঙ, মাংস ও বলবর্ধক। হজম শক্তি দুর্বল হলে বেশি আম খেতে নেই, তাতে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি। পাকা আমের মধ্যেও তফাত আছে । শহরে যে আম বিক্রি করা হয়, তা আসলে পাছপাকা নয়, এঁচড়ে পাকা। কাজেই এই আম কাঁচা আমের দোষ থেকে মুক্ত নয়; এ জন্য বলে আম খেলে ফোড়া হয়। আমাদের দেশে চাপাইনবাবগঞ্জ ও উত্তরবঙ্গ ছাড়া কোথাও তেমন আমবাগান নেই ।

আমবাগানে ফাগুন মাসে বোলের পাগল-করা ঘ্রাণ পাওয়া যায়। আমের মঞ্জরি হলদেটে-সবুজ ও এতে গোলাপিবেগুনির ছোপ থাকে। কোনো কোনো মঞ্জরি সাদাটে ধরনের আবার কোনোটি হালকা বেগুনি জাতের। বোলের গন্ধ শুকে বলা যায় কোন আম গুণে অতুলনীয় হবে । এই গুণ নির্ভর করে শাঁসের সুগন্ধ ও আঁশহীনতার ওপর । আমের সাধারণ আকৃতি হৃৎপিণ্ডের মতো।

ভালো জাতের আম থেকে বংশ বাড়াতে চাইলে কলম করাই উত্তম। সর্বোৎকৃষ্ট জাতের আমের বীজ পুঁতলেও যে চারা হয় তা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের হয়ে যায় । এ জন্য কৃষি-ফার্ম থেকে ভালো জাতের ভালো কলম সংগ্রহ করা উচিত। এ ছাড়া আমের রোগও আছে। আমগাছে পরগাছা হয় খুব । এ জন্য পরজীবীর রোগ যাতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। ক্ষতিকর পরজীবীর হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে সব সময় সযত্নে অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছেটে ফেলা উচিত। | আমের পাতা চিবিয়ে তা দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত নড়ে না, পড়েও না। আমের কুশি (কচি আমের আঁটির শাস) থেঁতো করে পানিতে ভিজিয়ে ছেকে ঐ পানি শুকনো চুলের গোড়ায় লাগালে চুল পড়া বন্ধ হয় । আমের কুশি ও হরীতকী একসঙ্গে দুধে বেটে | হেঁকে মাথায় লাগালে খুশকি কমে যায়। আরো অনেক রোগে আমের কুশি, পাতা ও ছাল ঔষধের আমের থেকে চাটনি, আচার ও অম্বল তৈরি করে খাওয়া যায়।

পাকা আমেরও চমক্কার চাটনি হয়, আমসত্ত্ব হয়। পাকা আমে দুধ-চিনি মিশিয়ে সুস্বাদু পানীয় হয়, এই পানীয় সারা বছর রাখা যায়। আমের রস টিনজাত করে, রসের পানীয় তৈরি করে সারা বছর ব্যবহৃত হচ্ছে। সুপ্রাচীন কাল থেকে আমের রসের গুণগান পাওয়া যায় সাহিত্যে ও ধর্মগ্রন্থে। বৌদ্ধ ও হিন্দুরা আমগাছকে বিশেষ পবিত্র মনে করে । বিবাহ, মঙ্গল-উৎসব অথবা দেবদেবীর পূজায় আমের পল্লব অপরিহার্য । পুরানো আমগাছের কাঠ দিয়ে। দরজা, কপাট, ছাদের তক্তা ও আসবাবপত্র তৈরি হয় । এ রকম উপকারী গাছ, ফলদায়ী বৃক্ষ, ছায়াময় চিরসবুজ তরু, ঔষধিগুণে ভরা এমন কল্পতরু আর দু’টি নেই ।

0মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Comment below if you have any questions

Contact form

নাম

ইমেল*

বার্তা*

-->