পেট্রোলিয়াম / Petroleum
পেট্রোলিয়াম কাকে বলে
পেট্রোলিয়াম প্রকৃতিতে প্রাপ্ত, প্রধানত হাইড্রোকার্বন দ্বারা গঠিত, দাহ্য তরল পদার্থ। এ তরল পদার্থ মাঝে মাঝে ঝরনা বা ডোবাতে পাওয়া যায়, কিন্তু সাধারণত কূপ খননের দ্বারা পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে উত্তোলন করা হয়। অশোধিত পেট্রোলিয়ামকে পূর্বে শিলাতেল (rock oil) বলা হতো, কিন্তু বর্তমানে সাধারণত অশোধিত তেল বলা হয়।
পেট্রোলিয়ামকে পাতনের দ্বারা বিভিন্ন অংশে পৃথক করা যায় : (১) একমাত্র (straight-run) গ্যাসোলিন, যা প্রায় ২০০° সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় ফোটে; (২) মধ্যম পাতিত তরল (middle distillate), যা প্রায় ১৮৫-৩৪৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফোটে এবং এ অংশ থেকে কেরোসিন, উত্তাপন করার তেল এবং ডিজেল, জেট, রকেট ও গ্যাস টারবাইনের জ্বালানি পাওয়া যায়; (৩) Wide-cut গ্যাস তেল, যা প্রায় ৩৪৫-৫৪০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফোটে এবং এ অংশ থেকে মোম, লুব্রিকেটিং তেল এবং অনুঘটকীয় বিয়োজনের (cracking) মাধ্যমে গ্যাসোলিন উৎপন্ন করার জন্য সরবরাহ বস্তু (feed stock); এবং (৪) অবশেষ তেল, যা অ্যাসফালটিক প্রকৃতির হতে পারে। উৎসের উপর নির্ভর করে পেট্রোলিয়ামের ভৌত ধর্ম এবং রাসায়নিক গাঠনিক উপাদান সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য প্রদর্শন করে। যেহেতু পেট্রোলিয়াম মাটি থেকে আসে এবং প্রধানত গ্যাসোলিন থাকে সেহেতু এর বর্ণ মাঝে মাঝে প্রায় বর্ণহীন তরল পদার্থ থেকে গাঢ় কালো আলকাতরা বর্ণের হয়ে থাকে এবং অ্যাসফালটের পরিমাণ বেশি থাকে। অধিকাংশ অশোধিত তেল কালো বর্ণের; অনেক অশোধিত তেল প্রতিসরিত আলো দ্বারা স্বচ্ছ হলুদাভ বাদামি, লাল বা বাদামি বর্ণ এবং প্রতিফলিত রশ্মি দ্বারা সবুজাভ প্রতিভা প্রদর্শন করে। এসব বস্তুর আপেক্ষিক গুরুত্বের পরিসর প্রায় ০.৮২ থেকে ০.৯৫।
পেট্রোলিয়ামের ৫০ থেকে ৯৮ শতাংশ হাইড্রোকার্বন এবং বাকি অংশ প্রধানত অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, বা সালফার সংবলিত জৈব যৌগ এবং সামান্য পরিমাণের জৈবধাতব যৌগ দিয়ে গঠিত। পেট্রোলিয়ামে বিদ্যমান হাইড্রোকার্বনগুলো হলো প্যারাফিন (অ্যালকেন), সাইক্লোপ্যারাফিন (ন্যাফথিন বা সাইক্লোঅ্যালকেন) এবং অ্যারোম্যাটিক যৌগ। অলিফিন (অ্যালকিন) এবং অন্যান্য অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন সাধারণত থাকে না।
কোনো নির্দিষ্ট স্ফুটন পরিসরে হাইড্রোকার্বনে কার্বন পরমাণুর সংখ্যা হাইড্রোকার্বনের ধরনের উপর নির্ভর করে। সাধারণত গ্যাসোলিনে ৪-১২ কার্বন পরমাণু সংবলিত হাইড্রোকার্বন; কেরোসিনে ১০-১৪ কার্বন পরমাণু; মধ্যম পাতিত তরলে ১২-২০ কার্বন পরমাণু; এবং wide-cut গ্যাস তেলে ২০-৩৬ কার্বন পরমাণু থাকে। গ্যাসোলিনে পাঁচটি প্রধান শ্রেণির যৌগ বিদ্যমান: সরল-শিকল প্যারাফিন, শাখান্বিত শিকল প্যারাফিন, অ্যালকাইল সাইক্লোপেন্টেন, অ্যালকাইল সাইক্রোহেক্সেন ও অ্যালকাইল বেনজিন।
অ্যাসফালট গাঢ় বাদামি থেকে কালো বর্ণের একটি কঠিন বা অর্ধকঠিন (semisolid) বস্তু যা কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, সালফার এবং কখনো কখনো নাইট্রোজেন দ্বারা গঠিত।
তিনটি উপাদান দিয়ে অ্যাসফালট গঠিত:
(১) অ্যাসফালটিন, একটি ভঙ্গুর অগলনীয় পাউডার;
(২) রেজিন, একটি অর্ধকঠিন থেকে কঠিন নমনীয় ও আসঞ্জনশীল বস্তু; এবং
(৩) তেল (এ উপাদানটি যে সকল লুব্রিকেটিং তেল থেকে জাত সেসব তেলের সঙ্গে গাঠনিক দিক থেকে সদৃশ)।
পেট্রোলিয়াম সঞ্চয়নে তিনটি ধাপ রয়েছে বলে মনে করা হয় :
(১) তেলের উৎপত্তি,
(২) প্রাথমিক প্রচরণ (উৎস থেকে আধার শিলাতে স্থানান্তর), এবং
(৩) দ্বিতীয় পর্যায়িক প্রচরণ (একটি কুণ্ড তৈরি করতে আধার শিলার ভিতরে তেলের পুনর্বণ্টন)।
পাললিক অববাহিকায় তেল উৎপন্ন হয়। এসব অববাহিকা হলো মহাদেশে বিদ্যমান অগভীর নিচু স্থান, যা মাঝে মাঝে সাগরের পানিতে নিমজ্জিত থাকে এবং মহাদেশীয় সোপানের উপকূলবর্তী অববাহিকা। এসব অঞ্চল শত শত বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং এতে তিন প্রকারের পলল থাকে:
(১) পাহাড় ও পর্বত থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত বালি ও এঁটেল শিলাকণা যা জলপ্রবাহের দ্বারা বাহিত হয়ে। অববাহিকায় সঞ্চিত হয়েছে;
(২) প্রাণরাসায়নিক ও রাসায়নিক অধঃক্ষেপ, যেমন—চুনাপাথর, জিপসাম, অ্যানহাইড্রাইট এবং চার্ট এবং
(৩) সাগরে জন্মানো গাছপালা ও প্রাণী বা নদী বাহিত জৈব বস্তু। তৃতীয় প্রকারের পলল, অর্থাৎ জৈব বস্তুই পেট্রোলিয়ামের উৎস।
বিশ্বাস করা হয় যে, জৈব বস্তু থেকে দুইভাবে তেল উৎপন্ন হয়। এ তেলের সামান্য পরিমাণ, সম্ভবত ১০ শতাংশেরও কম, তেল সামুদ্রিক জীবকোষের অংশ হিসাবে তৈরি হাইড্রোকার্বন থেকে সরাসরি আসে। দ্বিতীয় প্রক্রিয়া দ্বারা ৯০ শতাংশ তেল উৎপন্ন হয় যাতে চাপা পড়া জৈব বস্তুর পচন ও পরিবর্তন থেকে তেল উৎপন্ন হয়। যেসব হাইড্রোকার্বনে দশটি পর্যন্ত কার্বন পরমাণু থাকে এদের প্রায় সবটুকু এবং সম্ভবত অধিক আণবিক ওজনবিশিষ্ট হাইড্রোকার্বনের। অর্ধেকেরও বেশি পরিমাণ এ দ্বিতীয় প্রক্রিয়া দ্বারা উৎপন্ন হয়।
পেট্রোলিয়াম সঞ্চয়নের দ্বিতীয় ধাপে উৎস থেকে সম্ভারে পেট্রোলিয়ামের প্রাথমিক প্রচরণ ঘটে এবং এ কাজটি পানির চলাচল দ্বারা সম্পাদিত হয়। তেল ও তেলের প্রাকযৌগকে ঘনসন্নিবেশিত পলল থেকে পানি বের করে নিয়ে আসে। যখন তেলের উৎস কাদা অবক্ষেপিত হয় তখন এদের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পানি থাকে। বাকি অংশ প্রধানত এঁটেল মণিক বা কার্বনেট কণা জাতীয় কঠিন বস্তু। পাললিক অববাহিকাতে এসব কঠিন বস্তুর পুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে উপরের পললের চাপে পললের ভিতরের পানি বেরিয়ে। আসে। ঘনবিন্যাসের সূচনাতে ফুইড চলাচল সোজা হলেও পরবর্তীকালে পানি ও তেল সর্বাপেক্ষা কম প্রতিরোধ (সবচেয়ে কম উদস্থিতি চাপ) সম্পন্ন অঞ্চলের দিকে বাৎসরিক ২ থেকে ১০ সেমি. হারে ধাবিত হয়। ঘনবিন্যাসের মাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে ফ্লুইডের পার্শ্বীয় ও উল্লম্ব চলাচল ঘটে।
পেট্রোলিয়াম সঞ্চায়নের শেষ ধাপে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রচরণ ঘটে। এ পর্যায়ে তেলের কুণ্ড (pool) তৈরি করতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তেলের ফোটা সম্ভারের ভিতরে চলাচল করে। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রচরণে কখনো কখনো দ্বিতীয় ধাপ পরিলক্ষিত হয়, যে সময়ে পৃথিবীর ত্বকীয় চলন সম্ভার শিলার ভিতরে কুণ্ডের অবস্থান পরিবর্তন করে।
উৎপন্ন তেলের গাঠনিক উপাদান এবং বৈশিষ্ট্য তেলের উৎপত্তি ও প্রচরণের সকল দশা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তেল উৎপন্নকারী জৈব বস্তুর গঠন, গভীরতা বৃদ্ধির সঙ্গে হালকা হাইড্রোকার্বনের উৎপাদন বৃদ্ধি, উৎস শিলা থেকে হাইড্রোকার্বনের অংশবিশেষ বহনকারী প্রচরণ দশার নৈর্বাচনিকতা এবং অন্তর্ভূপৃষ্ঠে পানি ও ভূমির (ground) চলন দ্বারা সম্ভারের মধ্যে তেলের পরিবর্তন,—এসব কিছুই পেট্রোলিয়ামের গাঠনিক উপাদান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধারণা করা হয়।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions