উদ্ভিদ কোষ / Plant cell
উদ্ভিদ কোষ কি
উদ্ভিদকোষ (Plant cell) হলো উদ্ভিদ দেহের গঠন ও কাজের একক। গঠন ও কাজের উপর ভিত্তি করে উদ্ভিদকোষকে বিভিন্ন ভাবে ভাগ করা গেলেও এদের সবার মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রায় সকল উদ্ভিদকোষে কোষপর্দার (cell membrane) বাইরে দৃঢ় ও ভেদ্য কোষপ্রাচীর (cell wall) রয়েছে যা প্রাণীকোষে থাকে না। অবশ্য নিম্নশ্রেণির কিছু উদ্ভিদ গ্রুপেও কোষপ্রাচীর নেই, যেমন, Euglena জাতীয় শৈবাল। উদ্ভিদ দেহে কোষের বিন্যাস নানা ধরনের হতে পারে। এককোষী উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীব একটিমাত্র কোষ দ্বারা তাদের সকল জৈবনিক কার্যকলাপ সম্পন্ন করে থাকে (নীলাভ-সবুজ শৈবাল, অন্যান্য শৈবাল গ্রুপ, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া)। এককোষী উদ্ভিদের চেয়ে খানিকটা জটিল দৈহিক গঠনে (যেমন, ফিলামেন্টাস বা সূত্রবৎ শৈবাল) অনেক কোষ পরম্পর যুক্ত থাকলেও প্রতিটি কোষ জীবের সকল প্রয়োজনীয় কাজ করার ক্ষমতা রাখে। অবশ্য এ ধরনের কোনো কোনো উদ্ভিদে বিশেষ কিছু কোষ প্রজননে অংশগ্রহণ। করে (0edogonium spp.)। উচ্চতর উদ্ভিদে কোষগুলো নির্দিষ্ট কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কলা বা টিস্যু গঠন করে। এর ফলে তাদের মধ্যে শ্রমবন্টন (division of labour) দেখা যায়। এক বা একাধিক টিস্যু মিলিত হয়ে বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠন করে, যেমন, পাতা, কাণ্ড, মূল ইত্যাদি।
প্রাণি কোষের মতো উদ্ভিদকোষও নিউক্লিক অ্যাসিড, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, লিপিড ও বিভিন্ন অজৈব পদার্থ দ্বারা মূলত একইভাবে গঠিত। কোষের বিভিন্ন অঙ্গাণু ফসফোলিপিড মেমব্রেন দিয়ে তৈরি যাতে প্রোটিন ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিউক্লিক অ্যাসিড উপস্থিত থাকতে পারে।
প্লাস্টিড (plastid) উদ্ভিদকোষের সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও অনন্য অঙ্গাণু। অবশ্য বেশ কিছু উদ্ভিদ প্রজাতিতে প্লাস্টিড তৈরি হয়। যেমন: কিছু শৈবাল প্রজাতি, স্বর্ণলতা ইত্যাদি। এছাড়া ব্যাকটেরিয়া, নীলাভ-সবুজ শৈবাল ও ছত্রাকে প্লাস্টিড থাকে না। প্লাস্টিড হলো অর্ধভেদ্য ঝিল্লি দ্বারা আবৃত একটি কোষীয় অঙ্গাণু যার। অভ্যন্তরীণ ঝিল্লিতন্ত্রে (থাইলাকয়েড ও স্ট্রোমা ল্যামেলিতে) ক্লোরোফিল ও অন্যান্য রঞ্জক পদার্থ অবস্থান করে। প্রকৃত উদ্ভিদকোষের (eukaryotic plant cell) অন্যান্য অঙ্গাণুর মধ্যে রয়েছে মাইটোকন্ড্রিয়া, এন্ডােপ্লাজমিক রেটিকুলাম, গলগিবস্তু, লাইসোজোম ও রাইবোজোম। নিম্নশ্রেণির কিছু উদ্ভিদকোষের নিউক্লিয়াসের বাইরে সেন্ট্রোজোম নামক অঙ্গাণু থাকে যা মূলত প্রাণিকোষের বৈশিষ্ট্য। উদ্ভিদকোষের কোনো কোনো অংশ যেমন: ফ্ল্যাজেলা, কোষবিভাজনের মাকুতন্ত্র প্রভৃতি মাইক্রোটিউবিউল দ্বারা তৈরি। অধিকাংশ সজীব উদ্ভিদকোষের কেন্দ্রস্থলে বড় আকারের কোষ গহ্বর (vacuole) দেখা যায় যা প্রোটোপ্লাজম নির্মিত টেনোপ্লাস্ট নামক পাতলা পর্দা দিয়ে ঘিরে থাকে ও কোষরস ধারণ করে। আদি কোষে (prokaryotic cell), যেমন, নীলাভ-সবুজ শৈবাল ও ব্যাকটেরিয়ায়, ঝিল্লি-আবৃত কোষীয় অঙ্গাণুগুলো থাকে না। অধিকন্তু এসব কোষে নিউক্লিয়ার দ্রব্য নিউক্লিয়ার পর্দা দ্বারা আবৃত না থেকে। উন্মুক্তভাবে সাইটোপ্লাজমে অবস্থান করে।
উদ্ভিদকোষে সাধারণত একটি নিউক্লিয়াস থাকে। তবে অনেক সিনোসাইটিক (coenocytic) উদ্ভিদে প্রস্থ প্রাচীর সৃষ্টি না হওয়ায় একটি দেহে (যেমন, Vaucheria, Phycomycetes ছত্রাক) বা একটি কোষে (Sphaeroplea শৈবাল) অসংখ্য নিউক্লিয়াস থাকে। উচ্চতর উদ্ভিদে, যেমন, নারিকেলের সস্যে (endosperm) অসংখ্য নিউক্লিয়াস একটি সাধারণ মাতৃকায় অবস্থান করে। উচ্চতর উদ্ভিদের ফ্লোয়েমের পরিণত সিভনলে কোনো নিউক্লিয়াস থাকে না।ট্টজাইলেমের ভেসেল, ট্রাকিড, সকল স্লেরেনকাইমা কোষ পরিণত অবস্থায় মৃত হয়।
উদ্ভিদকোষের প্রধান সঞ্চিত খাদ্য শ্বেতসার (starch) হলেও গ্রুপভেদে সঞ্চিত খাদ্যও ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, যেমন, সূর্যমুখী গােত্রের সঞ্চিত খাদ্য ইনুলিন (inulin), Eaglena-তে প্যারামাইলন, ডায়াটমে তেল জাতীয় পদার্থ, নীলাভ-সবুজ শৈবালে ও ব্যাকটেরিয়ায় গ্লাইকোজেন ইত্যাদি। কোষে রেজিন, ট্যানিন, কেলাসিত ক্যালসিয়াম অক্সালেট (র্যাফাইড) বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট (সিস্টোলিথ) প্রভৃতি বর্জ্য পদার্থ জমা থাকতে পারে।
ব্যাকটেরিয়া ও নীলাভ-সবুজ শৈবাল কোষ অ্যামাইটোসিস (amitosis) বা দ্বি-বিভাজন (binary fission) প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়। এ ছাড়া আর সব প্রকৃত কোষ মাইটোসিস (mitosis) প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়। উচ্চতর উদ্ভিদের জননমাতৃকোষে মায়োসিসের (meiosis) ফলে যৌনকোষ তৈরি হয়।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions