খাদ্য সংরক্ষণ এর ইতিহাস
খাদ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি আবিষ্কারের ইতিহাস
খাদ্য সংরক্ষণের চেষ্টা মানুষের অতি প্রাচীন কাল থেকেই। গুহাবাসী যে মানুষ পশু শিকার করতো অথবা খাদ্য কুড়িয়ে আনত, ক্ষুধা পেলেই যে খাদ্য তার মিলবে এমন নিশ্চয়তা ছিল না। তাই তাকেও যথাসাধ্য খাদ্য জমাবার চেষ্টা করতে হতো। খুব সম্ভব ফল-মূল-শস্য অথবা মাছ-মাংস রোদে শুকিয়ে এটি সে করতো। কোন কোন খাদ্য গুহার ভেতরে ঠাণ্ডা, শুকনা জায়গায়ও জমিয়ে রাখতে আগুন আবিষ্কারের পর আগুনে দ্রুত শুকিয়ে অথবা ধোয়া দিয়ে খাদ্য সংরক্ষণের উপায় উদ্ভাবিত হয়।
রোম সাম্রাজ্যের বিস্তারের পর রোমান ধনী ব্যক্তিরা উপযুক্ত জায়গা থেকে বরফ ও তুষার আমদানি করতো খাদ্যকে ঠাণ্ডায় রেখে সংরক্ষিত করার জন্য। প্রাচীন ভারতে, চীনে মশলা ও চিনি সহযোগে খাদ্যকে দীর্ঘস্থায়ী করার কৌশল জানা ছিল। আমেরিকায় প্রথম দিকে যে সব ইউরোপীয়রা বসতি স্থাপন করে তাদের মধ্যে ধোয়া দিয়ে অথবা সিরকা ও লবণ সহযোগে আচার বানিয়ে বহু দিন ধরে খাবার জমিয়ে রাখার নিয়ম প্রচলিত ছিল।
আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণবিদ্যা জীবাণু তত্ত্বের অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত। সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে হল্যান্ডের বিজ্ঞানী আন্তন ভ্যান লাভেন হুক প্রথম তার অণুবীক্ষণে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুগুলো লক্ষ্য করেন এবং এদের ছবি আঁকেন। ১৭৬৫ সালে ইতালীয় প্রকৃতিবিদ ল্যাজারো স্প্যালানজানী দেখান যে জীবাণুগুলো আপনাআপনি সৃষ্টি হয় না, অন্য জীবের মত বংশ বৃদ্ধি করে। ১৮৫০-এর দিকে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর প্রমাণ করেন যে, কোন কোন জীবাণু যদিও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সাহায্য করে যেমন দৈ তৈরিতে, তেমনি দুধ প্রভৃতি পানীয়ের নষ্ট হবার পেছনেও জীবাণুই দায়ী।
১৭৯৫ সালে ফ্রান্সে লিকোনাস এপার্টের খাদ্য বোতলজাতকরণ উদ্ভাবনের মাধ্যমেই আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণ কৌশলের যাত্রা শুরু হয়। তিনি কিছুটা রান্না করা খাদ্য বোতলে সীল করে তা আবার ফুটন্ত পানিতে উত্তপ্ত করে নেন। এই পদ্ধতি দ্রুত বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করে। ১৮২০-এর দিকে সংরক্ষণের জন্য ধাতুর কৌটার ব্যবহার প্রচলন হয়। ১৮২৫ সালে আমেরিকার টমাস কেনসেট লোহার উপর টিনের পাতলা পর্দা দিয়ে এর কৌটায় খাদ্য সংরক্ষণের উপায় উদ্ভাবন করেন। এই কৌটাগুলোই পরে শুধু টিন বলেই পরিচিত হয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি খাদ্য সরবরাহের জন্য বরফ দিয়ে শীতলীকৃত গাড়ির ব্যবহার শুরু হয়। ঐ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্যবসায়িকভাবে যন্ত্রের সাহায্যে খাদ্য হিমায়ন শুরু হয় বটে তবে বাসায় সাধারণত আইস বক্স অর্থাৎ বরফ দেয়া বাক্সে খাবার ঠাণ্ডা রাখা হতো। ঘরে রেফ্রিজারেটর ব্যবহার চালু হয় ১৯২০-এর দিকে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রে।
প্রথম দিকে খাদ্য হিমায়নের সময় ধীর গতিতে হিমায়িত করতে হতো। এতে খাদ্যের মানে অবনতি ঘটতো। এ শতাব্দীর বিশের দশকে ক্লারেন্স বার্ডসাই দ্রুত হিমায়নের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। দ্রুত হিমায়নের ফলে খাদ্যের জীবকোষের ভেতরে জলীয় অংশ বড় কেলাসে না জমে ছোট কেলাসে জমতে পার। এতে কোষ দেয়াল বিদীর্ণ হয়ে রস বেরিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সৈনিকদের প্রয়োজনে শুষ্কায়িত খাদ্যের প্রচুর প্রয়োজন হয়। এ সময় যে গবেষণা হয় তারই ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে গুড়ো দুধ, ইনস্ট্যান্ট কফি ইত্যাদি জনপ্রিয় শুষ্কায়িত পানীয়ের প্রযুক্তিতে প্রচুর উন্নতি ঘটে।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions