Home » » টিনজাত খাদ্য কি

টিনজাত খাদ্য কি

টিনজাত খাদ্য

টিনজাত খাদ্য কি

আমাদের দেশে টিনজাত খাদ্যের প্রচলন বেশি নয়। কিন্তু টিনের খাবার আমাদের কাছে একেবারে অপরিচিতও নয়। আজকাল ভাবনা চিন্তা হচ্ছে মৌসুমী সবজি ও ফল টিনজাত করে অন্য সময় পাওয়ার ব্যবস্থা করার এবং কিছু কিছু রফতানিও করার। মাছের, বিশেষ করে ইলিশ মাছের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তাই খাদ্য টিনজাত করার প্রযুক্তিটি সম্বন্ধে আমাদের আগ্রহ থাকাটি স্বাভাবিক।

১৮০৯ সালে নিকোলাস এপার্ট নামে একজন ফরাসি বাবুর্চি প্রথম খাদ্য টিনজাত করার প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন। দুটি বিষয়ের উপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তা হলো—যে সবজিকে টিনজাত করা হবে তা যেন টাটকা আর খুব পরিষ্কার হয় এবং সংরক্ষিত খাদ্যের সাথে কোন বাতাস যেন না থাকে। যদিও আরো পঞ্চাশ বছর পর লুই পাস্তুর বাতাসে রাখা বা অপরিষ্কার খাদ্যে জীবাণুর বিষক্রিয়া আবিষ্কার করেছিলেন, এপার্টের পদ্ধতিতে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এ পদ্ধতিতে খাদ্যকে একটি নির্দিষ্ট সময় উত্তপ্ত করে তা গরম অবস্থাতেই বোতলে সীল করে দেওয়া হতো। কত সময় উত্তপ্ত করা হবে তা বিভিন্ন খাদ্যের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারিত হতো। কিছুদিনের মধ্যেই বোতলের বদলে টিনের পাতের কৌটা ব্যবহারের রীতি প্রচলিত হল।

এপার্টের আমল থেকে শুরু করে খাদ্য টিনজাত করার জনপ্রিয়তা এত বেড়ে গিয়েছে যে এখন কৌটাগুলো আর হাতে তৈরি ও ঝালাই করলে চলে না, এগুলো তৈরির ভার নিয়ে নিয়েছে অন্য বিশেষ শিল্প। এগুলোকে আমরা টিন বলি কিন্তু এর অধিকাংশই আসলে ইস্পাত। ইস্পাতের পাতলা পাতের উভয় তলে টিনের একটু প্রলেপ লাগিয়ে  নেওয়া হয় বলেই পুরো জিনিসটাকে টিন বলা হয়। শুধু ইস্পাতে মরচে ধরার ও খাদ্যকে দূষিত করার কারণ থাকে বলে টিনের এই প্রলেপ দেওয়া। টিন অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি দামী ধাতু। পুরো কৌটা টিনে তৈরি করা ব্যয়বহুল হবে। তথাকথিত টিনের বড় পাতকে সঠিক আকারে কেটে নিয়ে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে বেলনাকারে কৌটার বক্র অংশটি তৈরি হয়। একই সঙ্গে অন্য পাত থেকে চাকতির আকারের টুকরা কেটে নেওয়া হয় কৌটার তলা হিসেবে ব্যবহারের জন্য। এই তলার কিনারায় এমন খাজ থাকে এবং সেই খাজে এমন ঝালাই বস্তু দেওয়া থাকে যাতে সহজেই একে বায়ু নিরোধী করে জুড়ে দেওয়া যায়। এই অবস্থায় মুখ খােলা কৌটা পাঠিয়ে দেওয়া হয় খাদ্য টিনজাত করার কারখানায়।

বড় বড় টিনজাতকরণ কারখানার নিজস্ব শস্য বা সবজি সংগ্রহ ব্যবস্থা থাকে। সেখান থেকে টিনজাতের জন্য আদর্শ অবস্থায় একে কারখানায় আনার চেষ্টা করা হয়। যত তাড়াতাড়ি টিনজাতকরণের প্রক্রিয়া শুরু করা যায় খাদ্যের স্বাভাবিক স্বাদ-গন্ধ বজায় রাখার দিক থেকে ততই ভাল। ধরা যাক, মটরশুটি টিনজাত করা হবে। তা হলে মাঠ থেকে আনা মটরশুটিকে দ্রুত ছিলে নিয়ে প্রক্রিয়াকরণ শুরু করতে হবে। এ প্রবন্ধের বাকি অংশে আমরা এই মটরটির টিনজাতকরণকেই উদাহরণ হিসেবে বেছে নেব। অবশ্য অন্যান্য সবজি এবং কিছু কিছু ফলের ক্ষেত্রেও মোটামুটি এই একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

শুটি থেকে ছাড়াবার পর মটর দানাগুলোকে প্রবহমান পানির মধ্যে ধুয়ে নেওয়া হয় এবং দানার আকার গুণ অনুসারে বাছাই করা হয়। এরপর যে প্রক্রিয়া তার নাম ব্লাঞ্চিং। এর অর্থ ফুটন্ত পানিতে অথবা বাষ্পের ভাপে উত্তপ্ত করা। ব্লঞ্চিং-এর দ্বারা সবজির রং উন্নত হয় এবং একে স্পর্শে যে অনুভূতি হয় তাও অপেক্ষাকৃত ভাল হয়। এরপর কনভেয়ার বেল্টের উপর দানাগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে চোখে দেখে নিম্নমানের দানাগুলোকে হাতে বেছে ফেলা যায় ।

এবার টিন ভর্তি করার পালা। এর আগে অবশ্য টিনগুলো বাষ্প আর পানি দিয়ে খুব ভাল করে ধুয়ে নেওয়া হয়। বড় একটি পাত্র থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ মটরশুটি টিনে পুরে দেওয়া হয়। টিনটিকে এখন কানায় কানায় লবণ পানি দিয়ে ভর্তি করা হয়। এর সাথে সামান্য চিনি এবং মিন্টের সুগন্ধিও থাকে। অবশ্য উত্তপ্ত করার সময় আয়তনে বেড়ে যাবার কথা খেয়াল রেখে সামান্য কিছু খালি জায়গা টিনে রাখা হয়। এখন এমন অবস্থায় টিনের মুখটি সীল করে দেওয়া হয় যাতে এর মধ্যে কোন বাতাস অবশিষ্ট না থাকে।

বায়ু নিরোধী টিনের ভেতর মটরটি বদ্ধ হয়ে গেল বটে কিন্তু তখনো এর মধ্যে জীবাণু থাকার সম্ভাবনা রয়েছে যা বিনষ্ট করলে খাদ্য নিরাপদ থাকবে না। এজন্য বেশ কিছু মটরভর্তি টিনকে রাখা হয় বিরাট বিরাট সব প্রেশারকুকারে। এতে উচ্চ চাপে বাষ্পের সহায়তায় খাদ্যকে ১১৫° সে, উত্তাপে নিয়ে ২০-৩০ মিনিট রাখা হয়। এর ফলে একদিকে মটরশুটি যে রকম রান্না হয়ে যায়, অন্যদিকে টিনের ভিতরটা ক্ষতিকর জীবাণু মুক্ত হয়। এর পর আর একটি ব্যবস্থায় টিনগুলোকে ঠাণ্ডা করে নেওয়া টিনজাতকরণের জরুরি কাজগুলো এভাবে শেষ হয়ে গেলে টিনে লেবেলের কাগজ লাগানোর এবং একে বাক্সবন্দী করার কাজ শুরু হয়। যদিও গত শতাব্দীর প্রথম থেকেই খাদ্য টিনজাতকরণের কাজ চলে আসছে, তবুও এর উন্নয়নের জন্য গবেষণার আজও বিরাম নেই। বিভিন্ন খাদ্যের জন্য টিনজাতকরণের মূলনীতিটি সেই এপার্টের আমল থেকে খুব একটি পরিবর্তিত হয়নি। কিন্তু প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে উত্তাপ প্রয়োগের পরিমাণ, সময় পদ্ধতি ইত্যাদির সঠিক নিয়ন্ত্রণ করে খাদ্যের স্বাভাবিক স্বাদ-গন্ধ এবং পুষ্টি উপাদান আরো ভালভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা হচ্ছে। এক সময় টিনজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায় হাতে করা হতো। এতে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির এবং নিয়ন্ত্রণের ব্যাঘাত ঘটতো। আজকাল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার উপর। এর ফলে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নিখুঁতভাবে টিনজাত করা সম্ভব হচ্ছে।

আমাদের দেশেও কিছু কিছু খাদ্যের টিনজাতকরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ইলিশ মাছ, আনারস ইত্যাদি কিছু সম্ভাবনাময় খাদ্যের টিনজাত করার দেশীয় প্রযুক্তি নির্ধারিতও হয়েছে। অবশ্য ব্যবসায়িক ভিত্তিতে এখনো এগুলো তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। এখন বাধাগুলোর মধ্যে প্রযুক্তির চেয়ে উদ্যোগের অভাবটিই বেশি প্রকট হয়ে উঠছে। অথচ মৌসুমী খাদ্যগুলোকে উৎপাদন স্থানের কাছেই টিনজাত করার ব্যবস্থা করা গেলে এ সব মূল্যবান পুষ্টিসামগ্রী অপচয় বন্ধ হতো এবং বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনেরও একটি ভাল উপায় যোগ হতো।

0মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Comment below if you have any questions

Contact form

নাম

ইমেল*

বার্তা*

-->