রেফ্রিজারেটর কিভাবে কাজ করে
এক বোতল পানীয় ফ্রিজের ভেতরে রাখা হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এটি চমৎকার ঠাণ্ডা হয়ে গেলো—তৃষ্ণা নিবারণের জন্য। এতে আশ্চর্য হবার কি আছে—ফ্রিজের ভেতরটা | যে খুব ঠাণ্ডা, কিছু রাখলে ও রকম তো হবেই। | এটা বলতে যে রকম সোজা রেফ্রিজারেটর অর্থাৎ হিমায়ক যন্ত্রের হিমায়ন পদ্ধতি কিন্তু ততটা সহজ নয়। একটা জটিল প্রক্রিয়ায় এই যন্ত্রটির ভেতরে ঠাণ্ডা তরল পদার্থ অতিমাত্রায় কম উত্তাপেও টগবগ করে ফোটে। এতে হিমায়ক যন্ত্রের ভেতরে চাপের তারতম্য হয় এবং এর ভেতরে রাখা যাবতীয় বস্তু যেমন : খাবারদাবার, পানীয়, সবকিছুই তাদের প্রাকৃতিক উত্তাপ হারিয়ে ফেলে।
তাহলে আমরা দেখি নিত্যব্যবহার্য একটা হিমায়ক যন্ত্রের ভিতরে কি কি আছে? এর ভিতরে আছে একটা বদ্ধ ফাপা নল—যেটা পুরো হিমায়ক যন্ত্রটিকে পেঁচিয়ে ঘুরে ঘুরে একই জায়গায় গিয়ে মিলেছে। এ নলটির মধ্য দিয়ে অনবরত প্রবাহিত হচ্ছে একটি রাসায়নিক (তরল) পদার্থ—যার নাম ফ্রিয়ন (Freon}। এই তরল পদার্থটি স্বভাবে একটু খামখেয়ালি বটে! অতিমাত্রায় উচ্চচাপে না রাখলে এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তুলনামূলকভাবে বেশ নিম্ন তাপেও চঞ্চল হয়ে উঠে, বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে চায়। কোন পদার্থকে তরল অবস্থা থেকে বাষ্পীয় অবস্থায় যেতে হলে এর অণুগুলোকে অতি দ্রুত চলাচল করতে হয়। এই গতিবেগ পাওয়ার জন্য এবং একে ত্বরান্বিত করতে হলে অবশ্যই যেটি প্রয়োজন সেটি হল উত্তাপ। এই উত্তাপ তাকে পেতে হবে বাইরে থেকে, তার আশেপাশের পরিবেশ থেকে। অর্থাৎ পদার্থটির অণুগুলোকে তাদের চারপাশ থেকে তাপ শোষণ করতে হয়। কাজেই হিমায়ক যন্ত্রের ভেতরে নলের মধ্যে ফ্রিয়নের চঞ্চল হবার জন্য চাই উত্তাপ। হিমায়ক যন্ত্রের যে বাক্স বা আলমারী সদৃশ অবয়ব তার দেওয়ালটি তৈরি ভাল তাপ-নিরোধী বস্তু দিয়ে। বাইরের তাপ সহজে তাতে ঢুকতে পারে না। কাজেই ফ্রিয়ন বাক্সটির বাইরে থেকে এই তাপ শোষণ করতে পারে না। তা হলে এই তাপ অসিবে কোত্থেকে?
কেন? হিমায়ক যন্ত্রের ভেতর থেকে-ঐ যে এক বোতল পানি রাখা হল, তা থেকে—তাকে তাকে সাজানো সব খাবার দাবার থেকে, লেটুসের পাতা থেকে, পনির, দুধ, মাছ, মাংস, সজি সব থেকে। ফ্রিয়নকে এই তাপ সংগ্রহের জন্য অবশ্য এসব খাবার-দাবার স্পর্শ করতে হয় না—হিমায়ক যন্ত্রের গায়ে পেঁচানো নলের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময়ই সে তার প্রয়োজনীয় তাপ এসব জিনিস থেকে শুষে নেয়। | তাপ শোষণের পর তরল ফ্রিয়ন এবার একটি বাষ্পীভবন কামরায় গিয়ে সেখানে অধিক জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ফলে সঙ্গে সঙ্গে এর উপর চাপ কমে যায়। এই নিম্ন চাপের ফলে তরল ফ্রিয়ন এখানে বাষ্পীভূত হয়ে যায়। পরিভ্রমণরত ফ্রিয়ন গ্যাসকে এভাবে বেশিক্ষণ বাষ্পীয় অবস্থায় থাকতে দেয়া হয় না। ফ্রিয়ন অণুর ক্ষমতা অনুযায়ী তাপ শোষণ করার পর এই বাষ্প এবারে ঘনীভবনের কামরায় যায়। এখানে ফ্রিয়ন গ্যাসকে ছোট জায়গায় সংকুচিত করে তার উপর চাপ বাড়ানো হয়। উচ্চ চাপের ফলে ফ্রিয়ন অণু তার চাঞ্চল্য হারিয়ে ফেলে এবং ধীরে ধীরে পুনরায় তরলে পরিণত হয়। তরলীভূত হওয়ার সময় কিন্তু ঘটে উল্টো ঘটনা। কিছু তাপ তাকে এবার ছেড়ে দিতে হয় বাইরে। ছেড়ে দেওয়া এই বাড়তি তাপটুকু যাতে বাক্সের একেবারে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যায় সেরকম ব্যবস্থা থাকে। হিমায়ক যন্ত্রের পিছনে হাত দিলে এই তাপ অনুভব করা যায়।
এরপর আবার নতুন করে ফ্রিয়নের চক্র শুরু হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ ঠিক থাকে--ফ্রিয়নের এই পরিভ্রমণ চলতেই থাকে—তাপ নিয়ে বাষ্পীভূত হওয়া তারপর আবার ঘনীভূত হবার সময় সে তাপ ছেড়ে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া।
বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে কিন্তু হিমায়ক যন্ত্রে হিমায়ক হিসেবে ফ্রিয়ন ব্যবহার হতো না। যে সব রাসায়নিক তরল পদার্থ ব্যবহৃত হতো, সেগুলো হয় ছিল বিষাক্ত, ময় অতিমাত্রায় দাহ্য। ১৯৩০ সালে বিষক্রিয়াবিহীন, অদাহ্য এই ফ্রিয়ন উদ্ভাবন করেন টমাস মিডগুলি জুনিয়র নামে একজন রসায়নবিদ। এটি উদ্ভাবনের পর এর উপাদান। এবং এর গুণগত মানের উপর তিনি এত আস্থাবান ছিলেন যে একে তিনি এক বিশাল দর্শক সমাবেশে উপস্থাপন করতে গিয়ে নিজেই নিশ্বাসের সঙ্গে এটি গ্রহণ করেন এবং মোমবাতির শিখায় প্রবাহিত করান। ফলাফল অত্যন্ত শুভ হওয়ায় এই ঘটনার কিছু কালের মধ্যেই পরিষ্কার এবং নিরাপদ এই ফ্রিয়ন-এর ব্যবহার হিমায়ক হিসেবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

0মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions