ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস
ভারতীয় কংগ্রেস হল ভারতীয়দের সর্বপ্রথম রাজনৈতিক সংগঠন। ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলেও অচিরেই এ দলের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীকালে এ দলের নেতৃত্বে ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে।
পটভূমি
১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ছিল ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির জাতীয়তাবাদী চেতনার একটি সর্বভারতীয় প্রকাশ। ঔপনিবেশিক শাসনামলে এ অঞ্চলে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটে। ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি স্কুল-কলেজ ও ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠার ফলে ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অবকাঠামো রচিত হয়। তাছাড়া ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ ধর্ম ও সমাজ সংস্কারকের আবির্ভাব ঘটে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সুনির্দিষ্ট দাবি- দাওয়া ভিত্তিক এসোসিয়েশন বা সমিতি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। যেমন, বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি (১৮৪৩), কলকাতায় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন (১৮৫১), সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন (১৮৭৬), বোম্বে এসোসিয়েশন (১৮৫২) ইত্যাদি।
১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে উপনিবেশিক ভারতে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের এক ধরণের অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। ১৮৮৩ ও ১৮৮৫ সালে কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর উদ্যোগে দু'বার ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স' অনুষ্ঠিত হয়। একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার তাগিদ থেকেই তিনি এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
১৮৮৫ সালে ২৮ ডিসেম্বর বোম্বে শহরে অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাঙালি আইনবিদ উমেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মোট ৭২ জন প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেন। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আই.সি.এস. অ্যালেন অক্টোভিয়ান হিউম ছিলেন এর প্রধান উদ্যোক্তা। এ ব্যাপারে হিউম বড়লাট লর্ড ডাফরিনের সহযোগিতা পেয়েছিলেন। এ উদ্যোগের পেছনে ব্রিটিশ সরকারের পূর্ণ সমর্থন ছিল। ব্রিটিশরা লক্ষ্য করে যে, ভারতবর্ষে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অভ্যুদয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। তখন সে প্রতিষ্ঠান ও তার নেতৃত্ব যাতে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত থাকে, তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন অনুভব করে। তাই ব্রিটিশরা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে বলে কোন কোন বিশ্লেষক মনে করেন। অপরদিকে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় ভারতীয়দের মধ্যে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তাদের মধ্যে দাদাভাই নওরোজি, ফিরোজ শাহ মেহতা, এ টি তেলাঙ্গা, বদরুদ্দীন তৈয়বজি, সুব্রামানিয়াম আয়ার, রমেশচন্দ্র দত্ত প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতি-আদর্শ ও উদ্দেশ্য ছিল নিম্নরূপ :
১. ব্রিটিশ রাজশক্তির প্রতি আনুগত্য।
২. জাতি-ধর্ম-বর্ণ আঞ্চলিকতার সংকীর্ণতা দূর করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা।
৩. সরকারি চাকরিতে ভারতীয়দের যথোপযুক্ত সংখ্যায় নিয়োগ।
৪. শিক্ষা প্রসারের ব্যবস্থা।
৫. প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচন।
৬. আইন সভা পুনর্গঠন করে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা ও ক্ষমতার সম্প্রসারণ।
মোট কথা, কংগ্রেসের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত থেকে যতদূর সম্ভব উল্লেখিত স্বার্থসমূহ আদায়ের চেষ্টাকরা।
কংগ্রেসের প্রতি মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি
কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাকালীন অধিবেশনে উপস্থিত ৭২ জন প্রতিনিধির মধ্যে মাত্র ০২ জন ছিলেন মুসলমান। পরবর্তী অধিবেশনসমূহে মুসলমান প্রতিনিধিদের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তা ছিল নগণ্য। ইংরেজী শিক্ষাকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য ছিল। শুরুতে ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ করায় হিন্দুরা মুসলমানদের থেকে আর্থ- সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে যায়। এ প্রেক্ষাপটে কংগ্রেসে কার্যত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নওয়াব আব্দুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য ছিল। এ সকল নেতৃবৃন্দ কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা বা অন্য কোনো অধিবেশনে যোগদান করা থেকে নিজেদের বিরত রাখেন। হিন্দু প্রাধান্য রয়েছে এমন কোনো দলে যোগদান করলে স্বকীয়তা হারিয়ে যেতে পারে এ আশংকা তাদের মধ্যে সক্রিয় ছিল। এক্ষেত্রে মুসলমান সম্প্রদায়ের উপর উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ খানের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষণীয় ছিল ।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions