জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সদস্য প্রাপ্তির আবেদন করে। কিন্তু চীন তখন ভেটো প্রয়োগ করে। ১৯৭৪ সালে আবার আবেদন করলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সে বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সর্বসম্মতভাবে ১৩৬তম সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য প্রাপ্তির পূর্বেই জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থা যেমন- UNCTAD, IMF, WHO, IBRD ইত্যাদিতে যোগ দেয়। তবে জাতিসংঘের সাথে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্বাধীনতার পর থেকেই শুরু হয়। সদস্য প্রাপ্তির পর থেকে সে সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হয়।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ সনদের প্রতি আস্থাশীল। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫নং ধারায় আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে মূলত জাতিসংঘের প্রতি সমর্থনের আবশ্যকতা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সদা প্রস্তুত। বাংলাদেশ শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিবেশী ও দূরের সকল রাষ্ট্রের সাথে সহ-অবস্থানে বিশ্বাস করে। জাতিসংঘের আদর্শ মোতাবেক বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সাথে শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয় ।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে জাতিসংঘ ব্যাপক সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, খাদ্য, পুষ্টি, শ্রম-কল্যাণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সাহায্য অতুলনীয়। খাদ্য ঘাটতি লাঘব এবং জরুরি কার্যক্রমে সাহায্য প্রদানের জন্য ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) কার্যক্রম চালু হয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড ও জরুরি ত্রাণ কাজে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি থেকে সহায়তা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা FAO-এর প্রকল্পের সংখ্যা প্রায় দেড় শতাধিক। FAO ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে। বাংলাদেশে FAO-এর থানা ভিত্তিক উন্নত খাদ্য উৎপাদন, শস্যবীজ ও ফল উৎপাদন বৃদ্ধি, বন ও পরিবেশ উন্নয়ন, পশু সম্পদ, প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রভৃতি ক্ষেত্রে ২৭টির বেশি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। জাতিসংঘের স্বাস্থ্য বিষয়ক সহযোগী সংস্থা (WHO) বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, খাদ্য ও পুষ্টি উন্নয়নে ব্যাপক সাহায্য ও অনুদান প্রদান করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং পরিবেশ রক্ষায় ইউনেস্কো নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকা বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়। এছাড়া বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারও ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়। ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এর সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের ভাষা শহীদ দিবস ২১শে ফেব্রুয়ারিকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” ঘোষণা করে ।
বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘ কার্যক্রমের সাথে বাংলাদেশ সম্পৃক্ত থেকে সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ৫৪টি শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য সারা বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে।
পরিশেষে বলা যায়, জাতিসংঘ ও বাংলাদেশের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ করার পর থেকে এখন পর্যন্ত সে সম্পর্ক অটুট রয়েছে ।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions