হাদিস সংরক্ষণের পদ্ধতি
হাদিস সংরক্ষণ
ইসলাম বিশ্বমানবের জন্য এক চিরন্তন জীবনব্যবস্থা। এর প্রধান ভিত্তি কুরআন মাজীদ, যার হিফাযতকারী স্বয়ং আল্লাহ। ইসলামের দ্বিতীয় ভিত্তি মহানবীর (স) হাদিসকেও তাঁর সাহাবীগণ, তাবিঈন ও তাবি-তাবিঈন এবং পরবর্তী উম্মতগণ হিফাযত করে রেখেছেন।
হাদিস সংরক্ষণের উপায়
মুসলিম উম্মাহ হাদিস হিফাযতের জন্য প্রধানত চারটি পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন :
১. মুখস্থকরণ ২. লিখন ৩. শিক্ষাদান ও ৪. আমল বা জীবনে বাস্তবায়ন।
বিভিন্ন যুগে হাদিস সংরক্ষণ
হাদিস সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সংকলনের ক্রমবিকাশের চারটি যুগ রয়েছে:
প্রথম যুগ:
রাসূলের (স) নবুওয়াত প্রাপ্তি থেকে হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত ।
এ যুগে হাদিসের সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচারের কাজ চলছিল বিশেষভাবে চারটি উপায়ে-
(ক) মুখস্থকরণ (মৌখিকভাবে)
(খ) শিক্ষাদান
(গ) বাস্তব আমল
(ঘ) লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে। তবে এ সময়ও বিচ্ছিন্নভাবে হাদিসের বহু লিখিত সম্পদ পাওয়া যায় ।
দ্বিতীয় যুগ :
হিজরি ১০০-২০০ পর্যন্ত ১০০ বছর। এ যুগ দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথম হতে তৃতীয় শতাব্দীর প্রথম পর্যন্ত। এটা তাবিঈন ও তাবি-তাবিঈন-এর যুগ। এ যুগেও হাদিস মুখস্থকরণ, ব্যাপক চর্চা ও সংকলনের বিকাশ শুরু হয় এবং হাদিস শাস্ত্রের ক্রমবিকাশের ও সংরক্ষণের সর্বোত্তম ধারাটি ক্রমোন্নতির পথে অগ্রসর হতে থাকে। হাদিস লিখনের ব্যাপারে উমর ইবনে আবদুল আযীয (র) এক সরকারি ফরমান জারি করেন। এ ফরমানের ফলে হাদিস সংগ্রহ-সংকলনের যে প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছিল তা অদ্যাবধি অব্যাহত রয়েছে।
এ শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই হাদিসের অসংখ্য সংকলন তৈরি হয়ে সর্বত্র প্রচারিত হয়েছিল। সেই সঙ্গে হাদিসের ব্যাপক চর্চা অনুশীলন ও শিক্ষা দান চলছিল। এ সময়ে অসংখ্য হাফিয-ই-হাদিস জীবিত ছিলেন। তবে এ যুগের তিনজন বিশিষ্ট হাদিসের ইমাম ও তাঁদের সংকলিত হাদিসগ্রন্থ বিশেষভাবে বিখ্যাত ছিল-
১. ইমাম মালিক (র) ও তাঁর মুআত্তা গ্রন্থ;
২. ইমাম শাফিঈ (র) ও তাঁর কিতাবুল মুসনাদ এবং
৩. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) ও তাঁর মুসনাদ ।
তাছাড়াও ইমাম আবূ হানিফা ও ইমাম মালিকের ছাত্রগণ হাদিসের বিপুল জ্ঞানসম্ভার বক্ষে ধারণ করে সমগ্র মুসলিম জাহানের কেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। আর এর প্রচার ও শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
তৃতীয় যুগ :
হিজরি তৃতীয় শতাব্দীতে হাদিস চর্চা
হাদিস চর্চার স্বর্ণযুগ : হাদিস সংগ্রহ সংকলন ও সংরক্ষণের পরিপূর্ণতার যুগ। এ যুগে এমন সকল হাফিয-ই-হাদিসের জন্ম হয়, যাঁদের নজীর নেই এ যুগে হাদিস একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর এক একটি শাখা এবং বিভাগ সম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্রভাবে গঠিত হয়।
এ শতাব্দীর মুহাদ্দিস ও হাদিস বর্ণনাকারীগণ হাদিসের অনুসন্ধানে জলে-স্থলে পরিভ্রমণ করেন। মুসলিম জাহানের প্রতিটি কেন্দ্রে এবং প্রতিটি অঞ্চলে হাদিসের খোঁজে তন্ন তন্ন করে বেড়িয়েছেন।
পূর্ণ সনদসম্পন্ন হাদিসসমূহ স্বতন্ত্রভাবে বিন্যাস করেন। সনদ ও বর্ণনা সূত্রের ধারাবাহিকতা এবং এর বিশুদ্ধতার ওপর পূর্ণ মাত্রায় গুরুত্বারোপ করেন। এ প্রয়োজনে আসমাউর রিজাল বা (চরিত বিজ্ঞান) সংকলিত ও বিরচিত হয়। ফলে হাদিস যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের সূক্ষ্ম তত্ত্ব তথা Java, Cell as এবং swall was এক একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে গড়ে ওঠে। সিহাহ সিত্তাহও এ শতকেই সংকলিত হয়।
চতুর্থ যুগ :
হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে হাদিস চর্চা
তারপর এলো চতুর্থ যুগ। এ যুগ ছিল হাদিসের বিন্যাস, অলংকরণ, সংক্ষেপণ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের যুগ। এ চতুর্থ শতকে ইলমে হাদিস পূর্ণ পরিণতি লাভ করে। তৃতীয় শতকে ইলমে হাদিসের যে চর্চা ও উন্নয়ন সাধিত হয়, তা অতীত সকল কাজকে অতিক্রম করে। তৃতীয় শতকেই হাদিসের সনদকারীদের ইতিহাস, জীবন-চরিত পুঙ্খানু পুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই হয়, সর্বতোভাবে ইলমে হাদিস এক স্বয়ংসম্পূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে গড়ে ওঠে।
আর এ চতুর্থ শতকে পূর্বের শতকের কাজ-কর্মেরই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। তবে হাদিস গ্রন্থ প্রণয়নে এ শতকে স্বতন্ত্রভাবে কিছু কাজও সম্পাদিত হয়েছে।
এভাবে হাদিস শাস্ত্র নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গভাবে সংকলিত ও সম্পাদিত হয়।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions