খাবারের ঘ্রাণ সম্পর্কে বিজ্ঞান ও গবেষণা কি বলে? জেনে নিন!
খাবারের ঘ্রাণ
ঘ্রাণং অর্ধ ভোজনং আমাদের দেশে সনাতন প্রবাদ। ঘ্রাণের এই গুরুত্ব রসনার ব্যাপারে মানুষ চিরকালই অনুভব করেছে। শুধু এই অঞ্চলে নয় বিশ্বময়। তবে গুরুত্বটা কিন্তু শুধু রসনা তৃপ্তিতেই শেষ হয়ে যায়নি। মানব মনে এবং সাধারণভাবে প্রাণী জগতের নানা ক্ষেত্রে ঘ্রাণের ভূমিকাটি বেশ স্পষ্ট। এখন এর সুযোগ নিতে শুরু করেছে ব্যবসা জগত বৃহৎ আকারে।
ঘ্রাণ ছড়িয়ে খদ্দেরকে প্রলুব্ধ করার বিষয়টি নতুন নয়। আমাদের খাদ্য ভেজালের একটি | দিক বরাবরই ছিল কৃত্রিম ঘ্রাণ দিয়ে মানুষকে প্রবঞ্চিত করার মধ্যে; যেমন সরষের তেলের ক্ষেত্রে। কিন্তু এর উল্টোটাও ছিল। শহরের নামকরা রুটির তন্দুর যেখানে তার | আশেপাশে ঘোরাঘুরিটাও কম তৃপ্তিদায়ক ছিল না-তন্দুর থেকে বের করা টাটকা রুটির ঘ্রাণে এমনই আকর্ষণ। এতে সেই বেকারীর ব্যবসাও যে ভাল হতো সেটা বলা বাহুল্য। কিন্তু এই ঘ্রাণে, এই সাফল্যে কোন কৃত্রিমতা ছিল না। ইউরোপে যারা বিশ ত্রিশ বছর আগে গিয়েছেন গ্রোসারী দোকানগুলোর সামনে তাদের থমকে দাঁড়াতে হয়েছে সদ্য | রোস্ট করা কফি বীন গুড়ো করার ঘ্রাণে আকৃষ্ট হয়ে। এক্ষেত্রে অবশ্য শুধু ঘ্রাণ নয়, দৃশ্যটিও প্রলুব্ধকারী। বড় কাচের জানালার সঙ্গে থাকতো এই নয়নভরা কফি, গ্রাইন্ডিং মেশিন লালে সোনালিতে চকমকে এনামেল করা যায় গাত্র। উপরে বড় কাচ পাত্র থেকে কেমন করে সদ্য রোস্ট করা কফিবীন পড়েছে, কেমন করে ধীর গতি মোটরে পরিচালিত গ্রাইন্ডারে তা গুড়ো হচ্ছে, প্যাকেটে গিয়ে জমা হচ্ছে সবই ছিল দারুণ দর্শনীয় । কিন্তু ঐ ঘ্রাণটিই ছিল অমন, রীতিমত মনমাতানো। এই আয়োজনের পেছনে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য অবশ্যই ছিল, কিন্তু এতে কৃত্রিমতা ছিল না। ঐ কফি বীন, ঐ গন্ধ ছিল ষোল আনাই খাটি, যেমন ছিল তন্দুর থেকে বের করা রুটির গন্ধ।
এখন ঘ্রাণের বাণিজ্যিকীকরণটিতে এক নতুন মাত্রা—আসছে এবং যথারীতি এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে জাপান। এতে ঘ্রাণের ব্যবহারটি হচ্ছে বৃহদাকারে কিন্তু বিপণন হচ্ছে যে পণ্য তার সঙ্গে এই ঘ্রাণের কোন যোগাযোগ নেই। আর এটি রসনা শিল্পের মধ্যেও সীমাবদ্ধও নেই। ধরা যাক, ইউরোপ আমেরিকার একটি ট্রাভেল এজেন্টের দোকান এতে নতুন প্রযুক্তি ছড়িয়ে রেখেছে সঠিক মাত্রায় নারকেল তেলের সুরভি আর নানা বর্ণালী পোস্টার হাতছানি দিচ্ছে সাগর দ্বীপে নারকেল সুশোভিত তটে রৌদ্র মানার্থে ভ্রমণের। সজির দোকানে ভুর ভুর করছে সদ্য কাটা ঘাসের ঘ্রাণ অথবা মোটর গাড়ির শশা রুমে অত্যন্ত দামী চামড়ার ঘ্রাণ যাতে উঁচু মানের গাড়ির অভ্যন্তরের আবহ সৃষ্টি করে। বলাবাহুল্য এর সবই কৃত্রিম আসল জিনিস থেকে এ গন্ধ নির্গত হচ্ছে না। কিন্তু তবুও ক্রেতা প্রলুব্ধ হচ্ছে।
ঘ্রাণ যে মানুষের মন মেজাজ, আবেগ এবং সেই সঙ্গে তার আচরণকে অনেকখানি প্রভাবিত করে সে কথা যেন মানুষ নতুন করে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। এখানে মানুষ আর দশটি প্রাণী থেকে যে ভিন্ন নয় এ কথা বুঝতে এত দেরি হবার কথা ছিল। স্যামন মাছ (এবং খুব সম্ভব আমাদের ইলিশও) দীর্ঘক্ষণ সমুদ্রে কাটাবার পর মিঠা পানিতে জন্মস্থানে ফিরে যায় অদ্ভুত এক স্মৃতির পরিচয় দিয়ে। এটি সম্ভব হয় শৈশবে ঠিক তার জন্মস্থানের আশপাশের প্রাণী, জলজ উদ্ভিদ, খনিজ সবকিছু মিলিয়ে যে একক গন্ধ সেটি তার মস্তিষ্কে বিধৃত হয়ে থাকে। সেই গন্ধ শুকে শুকেই সে ফিরে যায় সঠিক জায়গায়। তেলাপিয়ার যে সব মাছ বাচ্চাদেরকে মুখের ভিতর রেখে বড় করে তারা কিন্তু গন্ধ দিয়েই যার যার বাচ্চা চিনতে পারে। ভয় পেলে কোন কোন মাছ বিশেষ গন্ধ ছড়িয়ে অন্যদেরকে সতর্ক করে দেয়। স্তন্যপায়ী পশুর অনেকেই নিজ নিজ এলাকার উপর আধিপত্য ঘোষণা করে তার বিশেষ গন্ধ দিয়ে সীমানা সুনির্দিষ্ট করে। এই গন্ধ অন্যদেরকে দূরে থাকতে সাবধান করে দেয়। ওরা এদিক ওদিক সরে গেলেও শেষ পর্যন্ত তার নিজের পালে যোগ দিতে পারে ঐ দলের একটি সামগ্রিক বিশেষ গন্ধ শুকে। পুরুষ বানরের নাক বন্ধ করে দিলে দেখা যায় তার আর স্ত্রী বানরের প্রতি কোন আগ্রহ থাকে না।
মানুষের জীবন অবশ্য অতখানি ঘ্রাণ নিয়ন্ত্রিত নয়। তবুও ঘ্রাণ তার আবেগ আর আচরণকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে বৈকি। যেমন স্ট্রবেরী ফলের ঘ্রাণ তৈরি হয় ৩৫টি বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের সংমিশ্রণে। ধরা যাক, ফলটিকে পিষে দেয়া হল। সঙ্গে সঙ্গে ঐ রাসায়নিক দ্রব্যগুলোর দু'একটির মধ্যে পরিবর্তন হয়ে ঘ্রাণে যে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আসে তা মানুষের নাক টের পায়। কাজেই মানুষের নাককেও অবহেলা করা যায় না—যেমন করছে না আজকের বৃহৎ বাণিজ্য।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions