প্রাচীন আরবের ভৌগলিক অবস্থান
কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ আরব উপদ্বীপ যুগ যুগ ধরে বিশ্বের নাভিকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আরবের পশ্চিমে লৌহিত সাগর ও সুয়েজ যোজক। পূর্বে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগর। দক্ষিণে ভারত মগাসাগর। উত্তরের সীমারেখা আলেপ্পো রাজ্য ও ফোরাত নদী। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়ে আরব উপদ্বীপ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশের মিলন স্থলে অবস্থিত। এশিয়ার মূল ভূখণ্ড ও আফ্রিকা মহাদেশের মাঝখানে অবস্থিত এ অঞ্চল ইউরোপ মহাদেশ থেকেও বেশি দূরে নয়। তাই এ উপদ্বীপকে যথাযথভাবেই তিন মহাদেশের মিলনকেন্দ্র হিসেবে আখ্যায়িত করা । হয়। অতীতকাল থেকেই ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্বের কারণে এ অঞ্চল বহুজাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের চলাচল পথ বা । ক্যারাভান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
উত্তর আরবের সামান্য কিছু স্থানে মরূদ্যান রয়েছে, সেখানে লোকবসতি গড়ে উঠেছে। এছাড়া প্রায় সমগ্র আরব অঞ্চল মরুময়। হিজায, নজদ এবং আল আহসা প্রদেশ নিয়ে আরব দেশ গঠিত। বর্তমানে সৌদি রাজবংশ কর্তৃর্ক আরবের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়। হাদরামাউত, ইয়েমেন এবং ওমান নিয়ে দক্ষিণ আরব গঠিত। আরব ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশ মরুময়। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের মিলনকেন্দ্র হিসাবে পরিগণিত হলেও এদেশ যেন সমগ্র বিশ্ব হতে বিচ্ছিন্ন। উত্তর-ভাগে ‘নুফুদ' মরুভূমি এবং নুফুদ হতে আরম্ভ করে দক্ষিণ ভাগ পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মাইল এলাকা জুড়ে রয়েছে আরবের বৃহত্তম মরুভূমি ‘আল-দাহনা' [আদ-রার, আল-খালি]।
আরবের প্রদেশসমূহ : ভৌগোলিক পরিবেশ বিবেচনায় আরবদেশ পাঁচ ভাগে বিভক্ত। যথা- ১. হিজায, ২. নজদ, ৩. ইয়ামেন, ৪. তিহামা, ৫. আরূজ।
হিজায : লৌহিত সাগরের পূর্বকূল ঘেঁষে সিরিয়া সীমান্ত হতে ইয়ামেন পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে হিজায বলে। এ হিজাযই ইসলামের কেন্দ্রস্থল। এতে মক্কা, মদিনা তায়েফ, জেদ্দা প্রভৃতি প্রসিদ্ধ শহরগুলো অবস্থিত। মক্কা, মদিনা ও তায়েফের সাথে রাসূল (সা.) এর গভীর সম্পর্ক ছিল। এই হেজাজের পবিত্র ভূমির বরকতে আরবগণ বিশ্বের ইতিহাসে অতুলনীয় মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন। জিদ্দা বিখ্যাত নদীবন্দর, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পানি পথে আগত সম্মানিত হাজীগণ অবতরণ করেন। হিজায শব্দের অর্থ হলো- পৃথক ও বিরত করা। যেহেতু হিজায অঞ্চলটি নজদ ও তিহামাকে মধ্যে পৃথক করেছে এজন্য এটি হিজায নামে অভিহিত হয়েছে। হিজাযের পশ্চিমাংশে লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় যথেষ্ট পরিমাণে ফসলাদি উৎপন্ন হয়।
তিহামা : তেহামা আরবি শব্দটি ‘তাহমুন’ হতে নির্গত। অর্থ হলো প্রচণ্ড গরম বা তাপ। এ প্রদেশে অধিক গরম পড়তাে বলে একে তিহামা নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ প্রদেশটি লোহিত সাগরের তীর হতে সারাত পর্যন্ত বিস্তৃত।
আরূজ : আরূজ প্রদেশটি নজদের দক্ষিণ হতে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। ইয়ামামা, বাহরাইন, উম্মান ও হাদরামাউত ইত্যাদি এ প্রদেশে অন্তর্ভূক্ত।
ইয়ামেন : হিজায থেকে আদন (Aden) পর্যন্ত লোহিত সাগরের কিনারা বেয়ে বিস্তৃত অঞ্চলকে ইয়ামেন বলে। এর উত্তরে হাদরামাউত, পূর্বে উম্মান এবং বাহরাইন, পশ্চিমে লোহিত সাগর অবস্থিত। এটি আরবের সর্বাধিক উর্বর ও চাষাবাদযোগ্য প্রদেশ। অতীতে এটি উন্নত ও উর্বর অঞ্চল হিসাবে বিখ্যাত ছিল। ইয়ামেন' আরবি শব্দ ‘ইয়ামেন' (দক্ষিণ) হতে নির্গত। এটি আরব ভূখণ্ড এবং কা'বা ঘরের দক্ষিণে অবস্থিত হওয়ার কারণে এ নামকরণ করা হয়।
নজদ : মধ্য আরবে ইয়ামেন হতে ইরা পর্যন্ত যে পাহাড়টি চলে গেছে তার পূর্ব অংশকে নজদ বলে। নজদের রাজধানী রিয়াদ। এটা হিজাযের পূর্বে এবং সিরিয়া মরুভূমির দক্ষিণে অবস্থিত। উঁচু ভূমিকে নজদ বলা হয়। এ অঞ্চলটি পার্শ্ববর্তী হিজায হতে উঁচু বলে একে নজদ বলে। এই প্রদেশের উত্তরাঞ্চলেই সংগঠিত হয়েছিল ইতিহাস প্রসিদ্ধ ‘দাহিস’ ও ‘বাসুস’ যুদ্ধ। প্রতিটি যুদ্ধই প্রায় চল্লিশ বছর দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।
0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Comment below if you have any questions